ডিপ্রেশনের চিকিৎসায় বাজারে আসছে কোরিয়ার ‘মাইন্ড হেডব্যান্ড’

২৫ জুন ২০১৭ | হাসিবুল হাসান শান্ত | ৬৬২

ট্যাগঃ , , ,

 

বিষণ্ণতা বা ডিপ্রেশনকে ২১ শতকের একটি গুরুতর অসুস্থতা চিহ্নিত করা হয়েছে। আধুনিক লাইফস্টাইলের নানা দিকের কারণে ক্রমবর্ধমানভাবে ডিপ্রেশনে আক্রান্ত জনসংখ্যা বেড়ে চলছে। বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় ৩৫ কোটি মানুষ ভুগছেন এই দুর্বিষহ মানসিক রোগে। বলা হচ্ছে ২০২০ সাল নাগাদ ডিপ্রেশন রোগ হিসেবে পুরো পৃথিবীর ১ নম্বর বোঝায় রুপ নেবে। অনেকভাবেই ডিপ্রেশন সারাবার চেষ্টা করে যাচ্ছেন গবেষকরা। ঔষধ, কাউন্সেলিং এর পাশাপাশি অত্যাধুনিক প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি ব্যবহারকে অনেকেই ডিপ্রেশন চিকিৎসার নতুন উপায় হিসেবে দেখছেন। এরকমই একুশ শতকের আনকোরা প্রযুক্তির এক প্রকার মাথার ব্যান্ড ব্যবহার করে ডিপ্রেশন সারাতে উদ্যোগী হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার একটি কোম্পানি ybrain।

 

ডিপ্রেশন বা বিষণ্ণতা

বর্তমান সময়ে আর্থ-সামাজিক, ব্যাক্তিক অক্ষমতা এবং অনুৎপাদনশীলতার প্রধান কারণ ডিপ্রেশন

 

কোরিয়া হেরাল্ডের রিপোর্ট অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রাথমিকভাবে ybrain এর Mindd Headband এর ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এই হেডব্যান্ডটির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিতভাবে মানুষের মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল লোবে (অক্ষিগোলকের উপরে কপাল থেকে মাথার তালুর আগে পর্যন্ত মস্তিষ্কের অংশ) ক্ষীণমাত্রায় তড়িৎ চালনা করা হয়।

 

ফ্রন্টাল লোবের অবস্থান

ডিপ্রেশনে মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল লোব প্রভাবিত হয় বেশি

 

ডিপ্রেশনে আক্রান্ত ব্যাক্তির ব্রেইন স্ক্যান

দুটো ব্রেইন স্ক্যানে হলদে, কমলা অঞ্চলগুলো সক্রিয়। স্পষ্টতই ডিপ্রেশনে ভোগা ব্রেইনে কর্মকাণ্ড হচ্ছে কম বিশেষ করে ফ্রন্টাল লোবে (ছবিতে উপরের অংশে)

 

নিউরোসায়েন্সের ভাষায় এই প্রক্রিয়াকে “ট্রান্সক্রেনিয়াল ডিরেক্ট কারেন্ট স্টিমুলেশন (tDCS)” বলা হয়। বাংলায় মানেটা এরকম- করোটির মধ্যে দিয়ে সমপ্রবাহ বিদ্যুৎ (Direct Current/ DC current) চালনার মাধ্যমে মস্তিষ্কে উদ্দীপনা সৃষ্টি।

 

ট্রান্সক্রেনিয়াল ডিরেক্ট কারেন্ট স্টিমুলেশন (tDCS)

ট্রান্সক্রেনিয়াল ডিরেক্ট কারেন্ট স্টিমুলেশন (tDCS) যেভাবে কাজ করে

 

মাইন্ড হেডব্যান্ডটি অত্যন্ত হালকা বিদ্যুৎ প্রবাহ ব্রেইনে চালনা করে নিউরনের ডিসচার্জ বা ক্ষরণকে নিয়ন্ত্রিত করে। ডিপ্রেশনে আক্রান্ত মস্তিষ্কের অভ্যন্তরের রাসায়নিক পরিবর্তনকে শুধরে দেয়। ইব্রেইন দাবি করছে, প্রতিবারে ২০ মিনিট করে সপ্তাহে কয়েকবার এই ডিভাইসটি ব্যবহার করলে ডিপ্রেশন কাটিয়ে উঠা সম্ভব ভালোভাবেই।

 

Ybrain হেডব্যান্ড

ভুরুর উপরে কপালে পরতে হয় মাইন্ড হেডব্যান্ড

 

গত চার বছরে ইব্রেইনের এই ব্যান্ডটি তৈরির জন্য ৯ মিলিয়ন ডলারের বেশি অনুদান পেয়েছে। আরও দেখা গেছে, মাইন্ড হেডব্যান্ডে ক্লিনিক্যাল পরীক্ষামূলক ব্যবহারে কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরি হয় নি বরং যথেষ্ট কার্যকরী হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। ২০১৩ সালে ব্রাজিলের সাও পাওলো বিশ্ববিদ্যালয়ে এক পরীক্ষায় দেখা গেছে ডিপ্রেশন কমাতে মাইন্ড ব্যান্ড ডিপ্রেশনের ঔষধের মতোই কার্যকরী। গবেষকদের মতে, একই সাথে ঔষধ এবং মাইন্ড ব্যান্ড ব্যবহার করলে সবচেয়ে ভাল ফলাফল পাওয়া সম্ভব।

 

 

ইব্রেন সিইও লি কি-ইওন হেরাল্ডকে এক বিবৃতিতে জানান, ইতোমধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের ১২ টি হাসপাতালে প্রযুক্তিটি ব্যবহার করা হয়েছে এবং ২০১৭ সালে আরও ৭০ টি হাসপাতালে পরীক্ষামূলকভাবে এই ডিভাইসটি ডিপ্রেশন চিকিৎসায় ব্যবহার করা হবে। এই বছরের শেষের এই কোম্পানিটি ইউরোপে এবং ২০১৯ সাল নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রে হেডব্যান্ডটি বাজারজাত করার আশা করছে।

 

ybrain মাইন্ড হেডব্যান্ড গ্যাজেট

FDA অনুমোদন পেলে ybrain হেডব্যান্ডটি পৃথিবীজুড়ে বাজারজাত করা সম্ভব হবে

 

ডিপ্রেশন এবং আত্মহত্যা প্রবণতা দক্ষিণ কোরিয়ায় একটি মারাত্মক প্রাণঘাতী রোগ হিসেবে চিহ্নিত। দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় পরিসংখ্যান অফিসের তথ্য অনুযায়ী ২০১৫ সালে প্রতিদিন প্রায় ৩৮ জন মানুষ আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিল। ঐ একই বছরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পরিসংখ্যানটি ছিল দক্ষিণ কোরিয়ার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ, অথচ যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যা দক্ষিণ কোরিয়ার চেয়ে ৬ গুণ বেশি।

মাইন্ড হেডব্যান্ড পাশাপাশি একটি ফোন অ্যাপও ছেড়েছে। এর মধ্যে রোগীরা তাদের ঘুম, ব্যায়াম এবং চিকিত্সা পদ্ধতি ইত্যাদি রেকর্ড করতে পারে পরবর্তী সেবার জন্যে। এই হেডব্যান্ডটি দিয়ে কিছু কিছু রোগের ডায়াগনোসিসও করা যাবে।

 

 

মন্তব্য করুন

×