দেহঘড়ির গবেষণার পথপ্রদর্শক তিন মার্কিন বিজ্ঞানী পেলেন চিকিৎসায় নোবেল পুরষ্কার

০৫ অক্টোবর ২০১৭ | অঙ্গার | ২৪৩

ট্যাগঃ

“আপনি কি ফাজলামো করছেন”? প্রায় চটে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন বিজ্ঞানী রসব্যাশ। সাতসকালে সুইডেন থেকে ফোন করে তাঁকে চিকিৎসায় নোবেল পুরষ্কার পাওয়ার জন্য অভিনন্দন জানালে তিনি এভাবেই উত্তর দিয়েছিলেন। রসব্যাশ ভেবেছিলেন কেউ একজন তাঁর সাথে প্র্যাঙ্ক করছে। এরকম মনে করাটাও একেবারে অস্বাভাবিক না। কেননা সম্ভাব্য নোবেলজয়ীদের তালিকাগুলোর একটিতেও তাঁর নিজের এবং বাকি দুজন – জেফ্রি হল ও মাইকেল ইয়াং কারুর নামই ছিল না। নোবেল কমিটির ভাষ্য অনুযায়ী,

পৃথিবীর ঘূর্ণনের সাথে তাল মিলিয়ে উদ্ভিদ-প্রাণী-মানুষ কিভাবে তাদের অভ্যন্তরীণ জৈবিক কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে তা নিয়ে যুগান্তকারী কিছু আবিস্কারের স্বীকৃতি হিসেবে জেফ্রি হল, মাইকেল রসব্যাশ এবং মাইকেল ইয়াং কে ২০১৭ এর চিকিৎসা বা ফিজিওলজিতে নোবেল পুরষ্কারে ভূষিত করা হয়েছে।

 

২০১৭ সালের চিকিৎসায় নোবেল পুরষ্কার ঘোষণা

২০১৭ সালের চিকিৎসায় নোবেল পুরষ্কার ঘোষণা

 

এই তিন মার্কিন বিজ্ঞানীর কেউই কল্পনা করেন নি নোবেল জেতার। কারণ তাঁদের গবেষণার ক্ষেত্র ছিল ভৌত বিজ্ঞান। সবখানেই এখন ফলিত গবেষণার জয়জয়কার। CRISPR নাকি Immunotherapy এর আবিষ্কারকরা নোবেল জিতবেন এই নিয়ে বিজ্ঞানী মহলে যখন তোলপাড় চলছে তখন Circadian Rhythm বা Biological Clock নিয়ে গবেষণার জন্য কেউ নোবেল জিতে নিবে এটা ছিল একেবারেই কল্পনার বাইরে। বায়োলজিকাল ক্লকের ব্যাপারটা একটু পরিস্কার করা নেয়া দরকার।

 

দেহঘড়ি বা বায়োলজিকাল ক্লক

দেহঘড়ি বা বায়োলজিকাল ক্লক

 

পৃথিবীর নিজ অক্ষে ঘুরপাকের ফলে দিন এবং রাতের যে পর্যায়ক্রমিক আবর্তন ঘটে তার প্রভাব রয়েছে সব রকম প্রাণের উপর। অতিকায় নীল তিমি থেকে ক্ষুদে পিঁপড়া কিংবা দানবীয় সিকোয়া বৃক্ষ থেকে তুচ্ছ ব্যাকটেরিয়া কেউই এই দিনে রাতে আলো আঁধারের প্রভাবের বাইরে নয়। সকল জীবের  ভেতরে যে এক রকমের জৈবিক ঘড়ি অবিরাম কাজ করে যায় এ খবর খুব একটা নতুন নয়। জীবেরা এই জৈবিক ঘড়ি বা বায়োলজিকাল ক্লকের মারফতেই দিনরাত্রির নিয়মিত ছন্দ অনুমান করে সে অনুযায়ী খাপ খাওয়াতে সফল হয়।

 

বায়োলজিকাল ক্লকের কাজ

দেহঘড়ি বা বায়োলজিকাল ক্লক আমাদের ঘুম, খাদ্যাভ্যাস, হরমোন নিঃসরণ, রক্তচাপ ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করে

 

গাছের বায়োলজিকাল ক্লক

দিন ও রাতের দৈর্ঘ্যের উপর গাছের প্রস্বেদন এবং ফুল ফোটা নির্ভর করে

 

৭২ বছর বয়েসি জেফ্রি হল রিটায়ার করেছেন যদিও তার আগে তার কর্মজীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছেন ম্যাসাচুসেটসের ব্রেন্ডিস বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে এখনও একজন ফ্যাকাল্টি হিসেবে কাজ করছেন মাইকেল রসব্যাশ। তার বয়স এখন ৭৩। আর ৬৮ বছর বয়েসি মাইকেল ইয়াং এখনও গবেষণাকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন নিউইয়র্কের রকাফেলার বিশ্ববিদ্যালয়ে।

১৯৮৪ সালে মাইকেল রসব্যাশ এবং জেফ্রি হল যখন ড্রসোফিলা মাছির উপর গবেষণা চালিয়ে Circadian Rhythm এর জন্য দায়ী ‘পিরিয়ড’ বা PER জিন আবিষ্কার করেন তখন দুজনে ছিলেন সহকর্মী। অন্যদিকে মাইকেল ইয়াং একাই দেহঘড়ির নিয়ন্ত্রক আরেকটি জিন আবিষ্কার করেন। ইয়াং এই জিনের নাম দেন ‘টাইমলেস’ বা TIM

 

ড্রসোফিলা মাছি

ড্রসোফিলা মাছি

 

পিরিয়ড এবং টাইমলেস দুটো জিনই বায়োলজিকাল ক্লকের ভারসাম্য রক্ষার জন্য জরুরি। পিরিয়ড জিন রাতের বেলায় কোষের ভেতর একটি প্রোটিন তৈরি করে যে প্রোটিনটির পরিমাণ দিনের বেলায় হ্রাস পায়। নেগেটিভ ফিডব্যাক প্রক্রিয়ায় এই প্রোটিনের পরিমাণ উঠানামা করে। আর টাইমলেস জিনের নির্দেশনায় যে প্রোটিন উৎপন্ন হয় তা পিরিয়ড প্রোটিনের সাথে কোষের নিউক্লিয়াসে প্রবেশ করে পিরিয়ড জিনের কাজকে নিয়ন্ত্রিত রাখে।

 

পিরিয়ড এবং টাইমলেস জিন যেভাবে কাজ করে

পিরিয়ড এবং টাইমলেস জিন যেভাবে কাজ করে

 

এভাবেই ২৪ ঘণ্টার আলোক এবং অন্ধকার পর্যায়ের সাথে তাল মিলিয়ে সকল জীব নিজস্ব বায়োলজিকাল ক্লকের ছন্দ বজায় রাখে। যখনই এই অভ্যন্তরীণ দেহঘড়ির সাথে বাইরের পরিবেশের ছন্দপতন হয় তখনই গোল বাধে। বিদেশ ভ্রমনের শেষে দেশে ফিরলে যে “জেট ল্যাগ” হয় এটা তারই একটি উদাহরণ।

 

জেট ল্যাগ

জেট ল্যাগ

 

এই সারকাডিয়ান রিদম যে শুধু জীবের অভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ডের ভারসাম্য রক্ষা করে তা নয়। কিছু কিছু রোগের ঔষধের কার্যকারিতাকেও তা প্রভাবিত করে। দেখা গেছে যে দিনের অন্য সময়ের চেয়ে সকাল বেলায় ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাকসিন নিলে তা কার্যকর হয় বেশি

তবে এ বছরের চিকিৎসায় নোবেল পুরষ্কার নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে ব্যাপক। ক্যান্সার, অ্যালঝেইমারস ডিজিজের মত মূর্তিমান কঠিন রোগের চিকিৎসা কিংবা বংশ পরম্পরায় ছড়িয়ে যায় যেসব জেনেটিক ডিজরডার সেগুলোর প্রতিকারের জন্যে নোবেল প্রাইজ না দিয়ে তুচ্ছ মাছির জীবন চলে কেমন করে সেই নিয়ে গবেষণার জন্য নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করার ব্যাপারটায় খাপ্পা হয়েছেন অনেকেই।

নোবেল কমিটি এই নিয়ে কোন খোলাখুলি মত না দিলেও সম্ভাব্য একটা ব্যাখ্যা আছে বিষয়টার। গত বেশ কিছু বছরে প্রত্যক্ষ ফলদায়ী সব রকমের ফলিত গবেষণার ক্ষেত্রে (যেমন HIV AIDS এর চিকিৎসা ইত্যাদি) অনুদান এবং অংশগ্রহণে স্বতঃস্ফূর্ততা বেড়েছে বহুগুণে। সে তুলনায় ভৌত বা বেসিক সায়েন্সের পেছনে অনুদান কমে যাওয়ায় গবেষণার প্রচেষ্টা প্রায় বন্ধ হবার উপক্রম। কিন্তু বেসিক সায়েন্স আমাদের প্রকৃতি প্রতিবেশ এবং আমাদের নিজেদের সম্পর্কে গভীর এবং মৌলিক অন্তর্দৃষ্টি অর্জনে সাহায্য করে। যে অন্তর্দৃষ্টি, লব্ধ জ্ঞান আমাদের আরাধ্য ফলিত গবেষণার ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। বলা যায় এই ভৌত গবেষণার ক্ষেত্রগুলোকে আরও সমৃদ্ধ এবং সমুন্নত রাখার প্রয়াসকে জারি রাখতেই এই প্রচ্ছন্ন বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন নোবেল কমিটি।

মন্তব্য করুন

×