Life of Pi এবং বায়োলুমিনিসেন্স

১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬ অঙ্গার ৮৯১

ইশকুল , , ,

 

Life of Pi সিনেমাতে “পাই” যখন সমুদ্রে ভেসে চলছিলো তখন এক রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে সে এক অভাবনীয় দৃশ্য দেখে চমকে উঠে। পাই দেখলো তার কোন-রকম-করে-বানানো ভেলার চারদিকে নীলাভ আলোর ছড়াছড়ি। শান্ত সমুদ্রের স্বচ্ছ পানিতে জ্বলজ্বল ক’রা হাজারো জেলিফিশ ঘুরে বেরাচ্ছে। ঘোর অন্ধকার রাতে সমুদ্রের বুকে যেন কেউ হালকা নীল-সবুজ আলো জ্বেলে রেখেছে। নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় ওর। পাই ভাবে তার হ্যালুসিনেশন হচ্ছে- কয়েক সপ্তাহ একটা ক্ষুধার্ত বাঘের সাথে সাগরে ভেসে চলছে সে, দিন রাতের কোন হিশেব নেই, খাবার আর পানির অভাব আর বাবা মাকে হারাবার তীব্র কষ্ট-সব মিলিয়ে তার স্বাভাবিক সেন্স ঠিক করে কাজ করছিলো না। কিন্তু পাই আদতে ভুল দেখেনি। ওটা হ্যালুসিনেশন ছিলো না।

 

Life of Pi সিনেমার একটি দৃশ্যে

Life of Pi সিনেমার একটি দৃশ্যে

 

সাগরের কিছু কিছু জায়গায় এরকম নীলাভ আলো দেখতে পাওয়া যায়। সোমালিয়ার পূর্ব উপকূলের কাছাকাছি ভারত মহাসাগরে “মিল্কি সি” নামে একটা অঞ্চল আছে যা রাতে জ্বলজ্বল করে।

 

মিল্কি সি

মিল্কি সি

 

মিল্কি সি

মিল্কি সি

 

কমবেশি ১৬০০০ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের (রাজশাহী বিভাগের চেয়ে কিছুটা ছোট!) এই ভূতুড়ে নীলাভ আলো-জ্বলা সমুদ্রেকে স্যাটেলাইট থেকেও দেখা যায়। ১৯১৫ থেকে এ পর্যন্ত ২৩৫ বার এ অঞ্চলের এমন ভূতুড়ে আলোর কারবার দেখেছেন বলে নাবিকেরা দাবি করেন। মালদ্বীপ, ইন্দোনেশিয়ার উপকূলেও এমন নীল আলো দেখতে পাওয়া যায় রাতে। ভারতের কেরালাতেও এমন দেখা গেছে।

 

ডিনোফ্লাজেলেট

ডিনোফ্লাজেলেট

 

অনুসন্ধানী বিজ্ঞানীদের একটি দল এই রহস্য বের করার জন্যে ১৯৮৫ সালে আরব সাগরের এ অঞ্চলের পানির নমুনা সংগ্রহ করেন। গবেষণার পর তাঁরা এর কারণ হিশেবে এক প্রকার ব্যাকটেরিয়াকে দায়ী করেন। তবে সাধারণত এক প্রকার প্ল্যাঙ্কটন (ডিনোফ্লাজেলেট ) এর কারণেই সমুদ্র রাতের বেলায় এরকম নীল দেখায়। কোন ভূতুড়ে, অলৌকিক কারণে ব্যাপারটা হয় না।

 

পেট্রিডিশে আইনস্টাইন: বায়োলুমিনিসেন্ট ব্যাকটেরিয়া দিয়ে আঁকা

পেট্রিডিশে আইনস্টাইন: বায়োলুমিনিসেন্ট ব্যাকটেরিয়া দিয়ে আঁকা

 

মালদ্বীপের সাগরতীরেও দেখা যায় নীল আলোর ছড়াছড়ি

মালদ্বীপের সাগরতীরেও দেখা যায় নীল আলোর ছড়াছড়ি, ঢেউ আছড়ে পড়লে কিংবা পানিতে আলোড়ন হলে আলোক-প্রভার সৃষ্টি হয়

 

পায়ের আওয়াজ শুনি...!

পায়ের আওয়াজ শুনি…!

 

বিজ্ঞানীরা গবেষণায় দেখেছেন লুসিফেরিন নামের একটি রাসায়নিকের পদার্থের কারণে এই ব্যাকটেরিয়া আর প্ল্যাঙ্কটনগুলো মৃদু নীল আলো বিকিরণ করে থাকে। লুসিফারেজ এনজাইমের মাধ্যমে লুসিফেরিন জারিত হয়ে অক্সি-লুসিফেরিনে পরিণত হলে এই নীলচে আলোর নিঃসরণ ঘটে।

 

থোকায় থোকায় জোনাক জ্বলে

থোকায় থোকায় জোনাক জ্বলে!

 

জোনাকি পোকার যে হলদে-সবুজ আলো তার কারণও লুসিফেরিন। যে সব জীবে লুসিফেরিন আর লুসিফারেজ এনজাইম রয়েছে সেগুলো এমন আলো নিঃসরণ করে থাকে। জীবের এই আলো তৈরির ক্ষমতাকে বায়োলুমিনিসেন্স (Bioluminescence, Bio= জীব, luminescence= আলো বিকিরণ) বলে।

 

আলোর উপস্থিতির ভিত্তিতে সমুদ্রকে তিনটি অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে

আলোর উপস্থিতির ভিত্তিতে সমুদ্রকে তিনটি অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে

 

আলো বিকিরণকারী জীব (bioluminescent organisms) ডাঙ্গার চেয়ে জলেই বেশি পাওয়া যায়। সমুদ্রের মাঝামাঝি গভীরতায় বায়োলুমিনিসেন্ট জীবের দেখা পাওয়া যায় বেশি, যেখানে সূর্যের আলো খুব একটা পৌঁছায় না (মেরিন বায়োলজিস্টরা এর নাম দিয়েছেন Twilight Zone)। এখানে প্রাণীর সংখ্যা খুব বেশি নয়। সামুদ্রিক প্রাণীদের ৯০ ভাগই বাস করে Daylight Zone এ, যতদূর পর্যন্ত সূর্যের আলোর বেশ ভালোভাবেই পৌঁছায়। গভীর সমুদ্রের প্রাণীদের মধ্যে ৮৫% ই বায়োলুমিনিসেন্ট ।

 

জ্বলজ্বলে জেলিফিশ!

জ্বলজ্বলে জেলিফিশ!

 

সামুদ্রিক প্রাণীদের মধ্যে ক্রিস্টাল জেলিফিশ, কম্ব জেলি, কয় জাতের অক্টোপাস, ভ্যাম্পায়ার স্কুইড, ফায়ারফ্লাই স্কুইড, কিছু প্রবাল (coral), ক্রিল (এক ধরণের স্বচ্ছ চিংড়ি)  বায়োলুমিনিসেন্স লক্ষ্য করা যায়। এরা সবাই অমেরুদণ্ডী।

 

কম্ব জেলি

কম্ব জেলি

 

ক্রিস্টাল জেলিফিশ

ক্রিস্টাল জেলিফিশ

 

চশমা পরা কলোসাল স্কুইড!

চশমা পরা কলোসাল স্কুইড!

 

ফায়ারফ্লাই স্কুইড

ফায়ারফ্লাই স্কুইড, নামটা কেন এমন হল বুঝতেই পারছ!

 

ক্রিল, একজাতের ছোট চিংড়ি

ক্রিল, একজাতের ছোট চিংড়ি

 

প্রবাল

প্রবাল

 

মেরুদণ্ডী সামুদ্রিক প্রাণীদের মধ্যে আলো নিঃসরণ করে (bioluminescent) অ্যাংগলার ফিশ, কুকি-কাটার শার্ক, একজাতের ড্রাগন ফিশ (স্টপ লাইট লুয-জ), ভাইপার ফিশ, ফ্ল্যাশলাইট ফিশ, ক্যাটশার্ক ইত্যাদি।

 

Finding Nemo মুভিতে নিমো এবং অ্যাংগলার ফিশ

Finding Nemo মুভিতে নিমো এবং অ্যাংগলার ফিশ

 

অ্যাংগলার ফিশ

অ্যাংগলার ফিশ

 

কুকি-কাটার শার্ক, ছোট একজাতের হাঙর

কুকি-কাটার শার্কের ছায়া যেনো অন্য শিকারি মাছ দেখতে না পায় সেজন্যে সে নীল আলো তৈরি করে

 

ফ্ল্যাশলাইট ফিশ

অন্ধকারে ফ্ল্যাশলাইট ফিশ

 

স্টপ লাইট লুয-জ ফিশ

ভয়ানক দেখতে স্টপ লাইট লুয-জ ফিশ

 

সাধারণত যোগাযোগ, খাবার খুঁজতে, শিকারকে আকৃষ্ট করতে, শিকারি প্রাণীকে ধোঁকা দিতে আর আত্মরক্ষায় বায়োলুমিনিসেন্স ব্যবহার করে এসব প্রাণীরা।

 

বায়োলুমিনিসেনস এর ব্যাবহার

বায়োলুমিনিসেনস এর ব্যাবহার

 

স্থলভাগে যেসব বায়োলুমিনিসেন্ট জীবের দেখা মেলে সেগুলো হোলো জোনাকি পোকা, এক জাতের কেঁচো, এক জাতের কেন্নো (millipede), এক প্রকার শতপদী (centipede), গ্লো-ওয়ার্ম (glow worm), এক প্রজাতির শামু্ক। এক ধরণের মাশরুমও রয়েছে যেগুলো অন্ধকারে জ্বলজ্বল করে।

 

 

জোনাকি পোকা

জোনাকি পোকা

 

কেন্নো

কেন্নো বা মিলিপিড

 

গুহার ভেতরে গ্লো-ওয়ার্ম

গুহার ভেতরে গ্লো-ওয়ার্ম

 

বায়োলুমিনিসেন্ট শামুক

বায়োলুমিনিসেন্ট শামুক

 

বায়োলুমিনিসেন্ট মাশরুম

বায়োলুমিনিসেন্ট মাশরুম

 

জাপানি রসায়নবিদ ওসামো শিমোমুরা ১৯৫৭ সালে লুসিফেরিন (প্রোটিন) আবিষ্কার করেন। জীববিজ্ঞান গবেষণায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিমোমুরা ২০০৮ সালে রসায়নে অসামান্য অবদানের জন্যে নোবেল প্রাইজ লাভ করেন।

 

Avatar মুভিতে বায়োলুমিনিসেন্স

Avatar মুভিতে বায়োলুমিনিসেন্স

 

 

মন্তব্য করুন

×