সেপিয়েন্স – মানব জাতির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস (১)

২৬ মে ২০১৭ দেবাশীষ সরকার ১,৩০৯

বই-পত্র , , , ,

তুচ্ছ এক প্রাণী

১৩৫০ কোটি বছর আগে বিগ-ব্যাং নামক এক মহাজাগতিক বিস্ফোরণের ফলে পদার্থ, শক্তি, স্থান এবং কাল গঠিত হয়। মহাবিশ্বের এই মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে যার কারবারি তার নাম পদার্থবিদ্যা।

এসব গঠিত হওয়ার তিন লক্ষ বছর পর পদার্থ ও শক্তি একে অপরের সাথে মিলিত হয়ে একটি জটিল কাঠামো গঠন করে যার নাম পরমাণু আর অসংখ্য পরমাণু একত্রিত হয়ে গঠন করে অণু। এসব অণু, পরমাণু এবং তাদের পারস্পরিক ক্রিয়া-বিক্রিয়ার খুঁটিনাটি নিয়ে কাজ রসায়নের।

প্রায় ৩৮০ কোটি বছর আগে, পৃথিবী নামক একটি গ্রহে নির্দিষ্ট কিছু অণু একত্রিত হয়ে একটি বৃহৎ ও জটিল কাঠামো সৃষ্টি করে যার নাম জীব (organism)। জীববিদ্যা আমাদের এই জীবদের গল্প শোনায়।

 

বিগ ব্যাং

বিগ ব্যাং এর পরেই সময় আর স্থান এর সৃষ্টি হয়েছিলো

 

প্রায় ৭০,০০০ হাজার বছর আগে, হোমো সেপিয়েন্স প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত প্রাণীরা আরও বিশদ কাঠামো গঠন করে যার নাম কালচার বা সংস্কৃতি। মানব সংস্কৃতির এই ধারাবাহিক বিকাশের নাম হল ইতিহাস।

 

কৃষি বিপ্লব

কৃষি বিপ্লব আর পশু পালন প্রায় একই সময়ে শুরু হয়েছিল

 

তিনটি তাৎপর্যপূর্ণ বিপ্লব ইতিহাসের গতিপথের রূপদান করেছে। কগনিটিভ বা বৌদ্ধিক-বিপ্লবের কারণে ইতিহাসের শুরু হয়েছিল ৭০,০০০ আগে। ১০,০০০ বছর আগের কৃষি-বিপ্লব এই ইতিহাসের গতিকে বাড়িয়ে দিয়েছিল আরও। মাত্র ৫০০ বছর আগে শুরু হয়েছিল বিজ্ঞান বিপ্লব। কিন্তু এরই মধ্যে বিজ্ঞান-বিপ্লব ইতিহাসের ইতি টেনে আনকোরা নতুন কিছু শুরু করার ক্ষমতা অর্জন করেছে । কিভাবে এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিপ্লব মানবজাতি আর তার সাথে সংশ্লিষ্ট জীবকুলকে প্রভাবিত করেছে সে কাহিনী নিয়েই এই বইটি।

 

বৈজ্ঞানিক বিপ্লব

মাত্র ৫০০ বছরে বিজ্ঞানের বদৌলতে অভাবনীয় সব পরিবর্তন এসেছে মানুষের জীবনে…

 

ইতিহাসের সৃষ্টি হওয়ার বহুকাল আগে থেকেই মানুষের বসবাস। অনেকটা আধুনিক মানুষের মত দেখতে প্রাণীর প্রথম দেখা মেলে ২৫ লক্ষ বছর আগে। অগণিত প্রজন্ম ধরে মানুষ অন্যান্য সব প্রাণীদের কাতারে ছিল। এবং তাদের সাথেই আবাস ভাগাভাগি করে বসবাস করতো মানুষ।

আজ থেকে ২০ লক্ষ বছর আগে আফ্রিকায় ঘুরতে বেরুলে আপনি হয়তো মানব চরিত্রের চেনাজানা কিছু বৈশিষ্ট্যের দেখা পেতেন। দেখতে পেতেন উদ্বিগ্ন মা তার সন্তানকে বুকে জড়িয়ে আদর করছে; ভাবনা-চিন্তাহীন শিশুদের দল মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে, কাঁদা ছুড়ছে। দেখতেন টগবগে তরুণদের, যারা সমাজের বিধিনিষেধ মেনে নিতে নারাজ আর শ্রান্ত বুড়োদের যারা হল্লা এড়িয়ে নিজেদের মত থাকতেই ভালবাসতেন। দেখা মিলত বুক-চাপড়ানো দাম্ভিক পুরুষদের যারা এলাকার সুন্দরীদের পটানোর যারপরনাই চেষ্টা করছে আর বিজ্ঞ, প্রবীণ কর্ত্রীদের যারা এসব সম্পর্কে অনেক আগে থেকেই ওয়াকিবহাল।

 

আদিম জীবনযাত্রা

আদিম জীবনযাত্রা

 

এই আদিম মানুষগুলো হাসতো, খেলতো, ভালবাসতো। ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব গড়ে তুলতো আর লড়াই করত পদমর্যাদা এবং ক্ষমতার জন্য। কিন্তু শিম্পাঞ্জী, বেবুন ও হাতিরাও তো তাই করতো। স্পেশাল কিছু ছিল না তাদের মধ্যে। ঘুণাক্ষরেও আদিম মানুষদের কেউ কখনো কল্পনা করেনি যে তারই বংশধররা একদিন চাঁদের বুকে পাড়ি জমাবে, পরমাণুকে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করবে, জেনেটিক সংকেতের রহস্য উদঘাটন করবে আর লিখে ফেলবে ইতিহাসের মস্ত কোন বই। প্রাগৈতিহাসিক মানুষদের ব্যাপারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল এই যে,  তারা ছিল তাৎপর্যহীন, তুচ্ছ। পরিবেশের উপর আদিম মানবের প্রভাব ছিল গরিলা, জোনাকি পোকা কিংবা জেলিফিশের মতই নগণ্য।

জীববিজ্ঞানীরা জীবকুলকে নানান প্রজাতিতে বিভক্ত করেন। যেসব প্রাণী একে অপরের সাথে মিলিত হয়ে প্রজননক্ষম সন্তান জন্ম দিতে পারে তারা একই প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত। ঘোড়া ও গাধা উভয়েই একই পূর্বপুরুষ থেকে আগত এবং উভয়ের শারীরিক বৈশিষ্ট্যে অনেক মিল রয়েছে। কিন্তু তাদের মধ্যে একে অপরের সাথে যৌন মিলনে অংশ নিতে তেমন কোন আগ্রহ দেখা যায় না। কৃত্রিমভাবে এদের মধ্যে যৌন মিলন ঘটানো যায় ঠিকই কিন্তু এর ফলে যে খচ্চরের জন্ম হয় তা বন্ধ্যা হয়ে থাকে। যে কারণে গাধার ডিএনএ’র মিউটেশন ঘোড়ার মধ্যে সঞ্চারিত হয় না। একইভাবে ঘোড়া থেকে গাধার বেলায়ও তাই । এদেরকে দুটি পৃথক প্রজাতির প্রাণী হিসেবে গণ্য করা হয় যারা বিবর্তনের দুটি ভিন্ন পথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছে।

 

খচ্চর

“কৃত্রিমভাবে এদের মধ্যে যৌন মিলন ঘটানো যায় ঠিকই কিন্তু এর ফলে যে খচ্চরের জন্ম হয় তা বন্ধ্যা হয়ে থাকে”

 

অন্যদিকে, একটি স্পেনিয়েল এবং একটি বুলডগ দেখতে আগাগোড়া ভিন্ন হলেও উভয়েই কুকুর প্রজাতির সদস্য। এরা একই ডিএনএ-রসদ (DNA pool) ভাগাভাগি করে ব্যবহার করে থাকে। সানন্দে এরা পরস্পর মিলিত হয়। আর এর থেকে জন্ম নেয়া কুকুরছানারা বড় হয়ে অন্য কুকুরদের সাথে জোড় বাঁধে এবং জন্ম দেয় আরও অনেক কুকুরছানার।

 

বুলডগ বনাম স্পেনিয়েল

স্পেনিয়েল এবং বুলডগ দেখতে আগাগোড়া ভিন্ন হলেও উভয়েই কুকুর প্রজাতির সদস্য…

 

একই পূর্বপুরুষ থেকে বিবর্তিত প্রজাতিগুলো একটি অভিন্ন গণের (genus) অন্তর্ভুক্ত। সিংহ, বাঘ, চিতাবাঘ এবং জাগুয়ার আলাদা আলাদা প্রজাতির কিন্তু তারা সবাই Panthera গণের সদস্য। জীবের (organism) নামকরণের সময় জীববিজ্ঞানীরা লাতিন ভাষা ব্যবহার করে থাকেন। এরকম নামের দুটো অংশ থাকে –  প্রথমটি “গণ” আর দ্বিতীয়টি হল “প্রজাতি”। যেমন- সিংহের বৈজ্ঞানিক নাম Panthera leo। এখানে Panthera হল গণ আর leo হল প্রজাতি। ধরে নেয়া যায়, এই বইটি যারা পড়ছেন তারা প্রত্যেকেই একেকটা Homo sapiens – Homo (মানব) গণের অন্তর্ভুক্ত sapiens (জ্ঞানী) প্রজাতির।

গণগুলি আবার একত্রিত হয়ে গঠন করে গোত্র। যেমন – বিড়াল (সিংহ, চিতাবাঘ, গৃহপালিত বিড়াল), কুকুর (নেকড়ে, খেঁকশিয়াল, শিয়াল) এবং হাতি (হাতি, ম্যামথ, ম্যাস্টোডন)। একই গোত্রের সকল সদস্য আবার আদিপিতা (patriarch) কিংবা আদিমাতার (matriarch) বংশধর। বিড়াল গোত্রের সমস্ত প্রাণী, উদাহরণস্বরূপ ছোট্ট একটি গৃহপালিত বিড়ালছানা থেকে হিংস্র সিংহ পর্যন্ত সবাই আড়াই কোটি বছর আগের অনেকটা বিড়ালের মত দেখতে একটি পূর্বপুরুষের বংশধর।

হোমো সেপিয়েন্সও একটি গোত্রের অন্তর্ভুক্ত। এই মামুলি তথ্যটি অনেকদিন ধরে ব্যাপক গোপনীয়তার সাথে লুকিয়ে রাখা হয়েছিলো। হোমো সেপিয়েন্সরা বহুদিন যাবত আর সব প্রাণীদের থেকে নিজেকে পৃথক ভাবতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করত। যেন এতিম সে কোন এক – যার কোন পরিবার নাই, ভাই-বোন-আত্মীয় নাই। সবচেয়ে গুরুতর ব্যাপার হল সেপিয়েন্সরা মনে করত তারা বাবা-মা ছাড়াই আবির্ভূত হয়েছে পৃথিবীতে। কিন্তু বিষয়টা তা নয়। ভাল লাগুক বা না লাগুক আসল কথা হল যে আমরা বনমানুষ বা গ্রেট এপ নামের একটি বড়সড়, কোলাহলপ্রিয় গোত্রের সদস্য।

 

শিম্পাঞ্জী আর মানুষের DNA এর তফাত মাত্র ২%

শিম্পাঞ্জী আর মানুষের DNA এর তফাত মাত্র ২%

 

এ সময়ের শিম্পাঞ্জী, গরিলা, ওরাং-উটানরা হল আমাদের সবচেয়ে কাছের আত্মীয় যারা এখনো টিকে আছে। এদের মধ্যে শিম্পাঞ্জী হচ্ছে আমাদের সবচেয়ে নিকটাত্মীয়। মোটামুটি ৬০ লক্ষ বছর আগে একটি মহিলা এপের দুটি মেয়ে ছিল।  এদের একজন থেকে সকল শিম্পাঞ্জীর জন্ম হয় , আরেকটি মেয়ে থেকে জন্ম নেয় সমগ্র মানবজাতি।

মন্তব্য করুন

×