স্যাপিয়েন্সঃ মানবজাতির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস (৫) – সহোদরের রক্ষক আমরা

০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭ অঙ্গার ৪৯২

বই-পত্র , , , ,

সহোদরের রক্ষক আমরা

(Our Brothers Keepers)

 

 

দেড় লক্ষ বছর আগে মানুষ ছিল নিতান্ত গোবেচারা এক প্রাণী। যদিও আগুনকে বেশ ভালভাবেই বাগে নিয়ে এসেছিল মানুষ। সিংহদের তাড়াতে, তীব্র শীতের রাতে উষ্ণতার জন্যে কিংবা জংলা পুড়িয়ে সাফ করতে মানুষ আগুনের ব্যবহার শিখে গিয়েছিল ততদিনে। তবু তাদের জনসংখ্যা তেমন আহামরি কিছু ছিল না। হয়ত সবক’টা প্রজাতি মিলিয়ে লাখ দশেকের মত মানুষ ছিল সেসময়। ইন্দোনেশিয়ান দ্বীপপুঞ্জ থেকে আইরেবিয়ান উপদ্বীপের মাঝের বিস্তৃত জায়গাজুড়ে ছিল তাদের বসবাস। ।

 

আইবেরিয়ান উপদ্বীপ

স্পেন এবং পর্তুগাল আইবেরিয়ান উপদ্বীপে অবস্থিত, ১৬ শতকে এ দুটো দেশ মিলে আইবেরিয়া নামে একটি ক্ষণস্থায়ী রাষ্ট্র গঠন করেছিল

 

এরিমধ্যে হোমো স্যাপিয়েন্স বিশ্বমঞ্চে তার জায়গা খুঁজে পেয়েছে। আফ্রিকার কোন এক প্রান্তে তখন নিজেদের নিয়েই মেতে ছিল তারা। আদিম মানুষদের থেকে ঠিক কোথায়, কখন বিবর্তিত হয়ে স্যাপিয়েন্সরা এসেছে তা পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে বেশিরভাগ বিজ্ঞানীই মনে করেন স্যাপিয়েন্সদের যাত্রা শুরু হয়েছিল দেড় লাখ বছর আগে।

তখন পূর্ব আফ্রিকা ছিল স্যাপিয়েন্সদের আনাগোনায় মুখর। এরা দেখতে হুবহু আমাদেরই মতন ছিল। দৈবক্রমে আধুনিক মর্গে যদি তাদের কারুর দেখা মিলত তাহলে কাটা-ছেঁড়ার পরও কোন প্যাথলজিস্ট সেই আদিম স্যাপিয়েন্সের দেহে অস্বাভাবিক কিছু খুঁজে পেতেন না। আগুনের তেলেসমতিতে রান্নায় অভ্যস্ত হয়ে উঠায় তদ্দিনে পূর্বপুরুষদের চেয়ে স্যাপিয়েন্সদের চোয়াল আর দাঁতের আকারও ছোট হয়ে গেছে। আবার মস্তিষ্কের আকারের দিক দিয়ে আমাদের সাথে তাদের কোন ফারাক ছিল না।

 

স্যাপিয়েন্সের প্রথম মাইগ্রেশন

পূর্ব আফ্রিকা থেকেই স্যাপিয়েন্সরা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিল

 

বিজ্ঞানীরা মনে করেন স্যাপিয়েন্সরা আনুমানিক ৭০,০০০ বছর আগে পূর্ব আফ্রিকা থেকে আরব উপদ্বীপে এসে পৌঁছায়। তারপর সেখান থেকে দারুণ দ্রুতিতে গোটা ইউরেশিয়া ভূখণ্ডে ছড়িয়ে পড়ে। হোমো স্যাপিয়েন্সরা যখন ঘুরে ঘুরে আরবে এসে হাজির হয় ইউরেশিয়ার একটা বড় অংশে তখন অন্য মানুষেরা দিব্যি বসবাস করছিল।

কি হয়েছিল তাদের?

দুটো পরস্পরবিরোধী তত্ত্ব আছে এ নিয়ে। একটি হল ‘আন্তঃপ্রজনন’ তত্ত্ব। পারস্পরিক আকর্ষণ, যৌনতা এবং মেলামেশার কাহিনী নিয়ে এই তত্ত্বটি। এ তত্ত্ব অনুযায়ী, স্যাপিয়েন্সরা আফ্রিকা থেকে সমগ্র পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে আর অন্যান্য মানব প্রজাতিগুলোর সাথে মেলামেশা এবং প্রজননে অংশ নেয়। আধুনিক সব মানুষ সেই সংকরায়নের ফসল।

যেমন, স্যাপিয়েন্সরা মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপে পৌছালে নিয়ান্ডারথালদের মুখোমুখি হয়। এই মানুষগুলো স্যাপিয়েন্সদের তুলনায় বেশ শক্তপোক্ত ছিল।

 

নিয়ান্ডারথাল বনাম স্যাপিয়েন্স

নিয়ান্ডারথাল বনাম স্যাপিয়েন্স

 

নিয়ান্ডারথালদের মস্তিষ্ক আকারে স্যাপিয়েন্সদের চেয়ে বড় ছিল। ঠাণ্ডা জলবায়ুতেও দারুনভাবে খাপ খাইয়ে নিয়েছিল তারা।

 

নিয়ান্ডারথালরা ইউরোপের তীব্র শীতে মানিয়ে নিয়েছিল বেশ

নিয়ান্ডারথালরা ইউরোপের তীব্র শীতে মানিয়ে নিয়েছিল বেশ

 

শিকারী হিশেবেও নিয়ান্ডারথালদের দক্ষতার পরিচয় পাওয়া গেছে । আগুনের ব্যবহার তাদের জানা ছিল। হাতিয়ার তৈরি ও ব্যবহারেও এরা কম যেত না। এবং তাদের স্বজনরা রুগ্ন, অসহায়দের দেখাশুনা করতো।

 

নিয়ান্ডারথালদের ম্যামথ শিকার

নিয়ান্ডারথালদের ম্যামথ শিকার

 

প্রত্নতাত্ত্বিকরা এমন কিছু নিয়ান্ডারথালদের হাড়গোড় খুঁজে পেয়েছেন যারা গুরুতর শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়েও বেঁচে ছিল বহুদিন। আপনজনেরা যে তাদের যত্নআত্তি করতো তার প্রমাণ মেলে এ থেকেই।

 

গুহাবাসী নিয়ান্ডারথাল পরিবার

গুহাবাসী নিয়ান্ডারথাল পরিবার

 

ছবিতে, ক্যারিক্যাচারে নিয়ান্ডারথালদের যেমন মার্কামারা বর্বর আর অথর্ব ‘গুহাবাসী’ দেখানো হয় ব্যাপারটা মোটেও তা নয়।

 

নিয়ান্ডারথালরা ততটুকুই মানবিক ছিল যতটুকু ছিল স্যাপিয়েন্সরা

নিয়ান্ডারথালরা ততটুকুই মানবিক ছিল যতটুকু ছিল স্যাপিয়েন্সরা

 

আন্তঃপ্রজনন তত্ত্ব মতে, স্যাপিয়েন্সরা ইউরোপে পৌঁছে সেখানের নিয়ান্ডারথালদের সাথে মিলেমিশে এক হয়ে যায়। যদি দুটি প্রজাতির মানুষের এরকম মিশ্রণ সত্যিই হয়ে থাকে তাহলে আজকের ইউরেশিয়ানরা খাঁটি স্যাপিয়েন্স নয়। নিয়ান্ডারথাল এবং স্যাপিয়েন্সদের মিশেল তারা।

একইভাবে পূর্ব এশিয়ায় গিয়ে হাজির হলে সেখানের স্থানীয় ইরেক্টাসদের সাথে বহিরাগত স্যাপিয়েন্সদের মিশ্রণে একটি সংকর জাতের সৃষ্টি হয়। চীনা আর কোরিয়ানরা তাদেরই বংশধর।

 

মঙ্গোলয়েড মানুষের বিবর্তন

মঙ্গোলয়েড মানুষের বিবর্তন

 

এ নিয়ে একটি বিরোধী তত্ত্বও আছে যা ঠিক উল্টো ব্যাখ্যা দেয়। এই ‘প্রতিস্থাপন তত্ত্ব’ শোনায় পারস্পরিক অমিল, ঘৃণা আর গণহত্যার বর্বর ইতিহাস। প্রতিস্থাপন তত্ত্ব মতে, প্রজাতিগুলোর দৈহিক গঠনে ভিন্নতা ছিল। যৌন মিলনের ধরণও একেক প্রজাতির বেলায় ছিল একেক রকম। এমনকি প্রজাতিভেদে গায়ের গন্ধও ছিল আলাদা।

এসব কারণে ভিন্ন প্রজাতির মানুষের মধ্যে শরীরী মেলামেশায় কোন ঝোঁক ছিল না। তারপরও কোন নিয়ান্ডারথাল রোমিও আর স্যাপিয়েন্স জুলিয়েটের মধ্যে যে প্রেম হতো না তা না।

 

স্যাপিয়েন্স রোমিও আর নিয়ান্ডারথাল জুলিয়েট

স্যাপিয়েন্স রোমিও আর নিয়ান্ডারথাল জুলিয়েট

 

তবে তাদের সন্তানরা বন্ধ্যা হয়ে জন্মাত। কেননা ততদিনে এই দুটো প্রজাতির মানুষের মধ্যে জিনগত পার্থক্য এত বৃদ্ধি পেয়েছিল যে তাদের আর সংমিশ্রণ সম্ভব ছিল না। পুরোপুরি স্বতন্ত্র দুটো প্রজাতিতে পরিণত হয়েছিল তারা। তাই নিয়ান্ডারথালরা যখন মারা পড়লো বা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলো তখন তাদের জিনও হারিয়ে গেল কালের গর্ভে।

এই তত্ত্ব অনুযায়ী, স্যাপিয়েন্সরা অন্য প্রজাতির মানুষদের সাথে মিশে গিয়ে এক হয়ে যায় নি। বরং সবাইকে হটিয়ে দিয়ে তাদের জায়গা দখল করে নিয়েছিল স্যাপিয়েন্সরা। সেক্ষেত্রে বলা যায় সব আধুনিক মানুষ যাত্রা শুরু হয়েছে ৭০,০০০ বছর আগে পূর্ব আফ্রিকা থেকে। এবং আমরা সবাই হলাম ‘খাঁটি সেপিয়েন্স’।

এই বিতর্কের উপর বহু কিছু নির্ভর করছে। ৭০ হাজার বছর বিবর্তনের দৃষ্টিকোণ থেকে কোন লম্বা সময় নয়। প্রতিস্থাপন তত্ত্ব সঠিক হলে সব আধুনিক মানুষ কমবেশি একই রকম জেনেটিক মালমসলা নিজের মধ্যে বয়ে বেড়াচ্ছে। এখানে জাতিগত শ্রেষ্ঠতার কোন স্থান নেই।

কিন্তু যদি আন্তঃপ্রজনন তত্ত্ব সত্যি হয় তাহলে বিষয়টা খুব গোলমেলে হয়ে যায়। এক্ষেত্রে মেনে নিতে হয় যে, আফ্রিকান, এশিয়ান আর ইউরোপিয়ানদের মধ্যে জিনগত পার্থক্য রয়েছে আর তা হাজার হাজার বছর ধরেই চলে এসেছে। রাজনীতির মাঠে এটা এক ডিনামাইট যা থেকে বিস্ফোরক বর্ণবাদী জাতিতত্ত্বের সূত্রপাত হতে পারে।

গেল কয়েক দশক ধরে প্রতিস্থাপন তত্ত্ব বিজ্ঞানীমহলে স্বীকৃত সত্য হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। এর পেছনে জোরালো প্রত্নতাত্ত্বিক সমর্থন ছিল। রাজনৈতিক দূরদর্শিতার বিচারেও নিখুঁত ছিল তত্ত্বটি। [আধুনিক মানুষের নানান জাতির মধ্যে জিনগত বৈচিত্র্য বিদ্যমান এমন দাবি তুলে বর্ণবাদ আর বিদ্বেষের নতুন মাত্রা সৃষ্টির কোন ইচ্ছে ছিল না বিজ্ঞানীদের ]

কিন্তু ২০১০ সালে চার বছরের দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর নিয়ান্ডারথাল মানুষের জিন মানচিত্র প্রকাশিত হলে প্রতিস্থাপন তত্ত্ব আর ধোপে টিকল না। জীবাশ্ম থেকে নিয়ান্ডারথাল মানুষের অখন্ড ডিএনএ সংগ্রহ করতে সক্ষম হলেন জিনতাত্ত্বিকরা। এর ফলে মোটা দাগে এই সময়ের মানুষের ডিএনএ আর বিলুপ্ত নিয়ান্ডারথাল মানুষের ডিএনএ এর মধ্যে তুলনা করা সম্ভব হল। যার ফলাফল চমকে দিয়েছিল বিজ্ঞানী মহলকে।

 

নিয়ান্ডারথাল জিন মানচিত্র

নিয়ান্ডারথাল জিন মানচিত্র

 

দেখা গেল মধ্যপ্রাচ্য আর ইউরোপের আধুনিক মানুষদের অনন্য ডিএনএ’র ১-৪ ভাগ আসলে নিয়ান্ডারথাল ডিএনএ। পরিমাণটা ব্যাপক নয় কিন্তু নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। তার কয়েক মাস বাদেই এলো দ্বিতীয় ধাক্কাটা।

 

সাইবেরিয়ার দেনিসোভান গুহা

সাইবেরিয়ার দেনিসোভান গুহা

 

দেনিসোভায় পাওয়া আঙ্গুলের একটি জীবাশ্ম থেকে পাওয়া ডিএনএ’র মানচিত্র তৈরি হলে দেখা গেল আধুনিক মেলানেশিয় এবং অস্ট্রেলীয় আদিবাসীদের ডিএনএ’র প্রায় ৬% এসেছে দেনিসোভান ডিএনএ থেকে।

 

দেনিসোভান মানুষরা যেভাবে অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছেছিল

দেনিসোভান মানুষরা যেভাবে অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছেছিল

 

দেনিসোভান আঙ্গুলের হাড়ের একাংশ

সাইবেরিয়ায় প্রাপ্ত অঙ্গুলের এই হাড় থেকেই দেনিসোভান মানুষের জিন মানচিত্র তৈরি হয়েছে

 

যদি এই ফলাফল বৈধ হয় তাহলে মানতে হবে আন্তঃপ্রজনন তত্ত্বের কিছু ধারণা ঠিকঠাক ছিল। তবে আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে এই বিষয়ের গবেষণা শুরু হয়েছে মাত্র কদিন হল। আরও গবেষণার জায়গা আছে এবং অনুসন্ধানও জারি আছে। এসব গবেষণার ফলাফল আন্তঃপ্রজনন তত্ত্বকে যেমন শক্তিশালী করে তুলতে পারে তেমনি তার ভিতকেও নাড়িয়ে দিতে পারে। আবার অন্যদিকে, আন্তঃপ্রজনন তত্ত্বের স্বপক্ষে কিছু প্রমাণ মিলেছে বলে যে প্রতিস্থাপন তত্ত্বটি আগাগোড়া ভুল এমনও নয়।

 

স্যাপিয়েন্স জিনোমের মাইক্রোেঅ্যারে

স্যাপিয়েন্স জিনোমের মাইক্রোেঅ্যারে,  প্রতিটি রঙ্গিন চতুর্ভুজ আমাদের DNA এর বিভিন্ন খণ্ডিত  অংশকে নির্দেশ করে, এই অংশগুলো কি কাজে লাগে সেগুলো আমরা বের করতে সক্ষম হয়েছি

 

যেহেতু আমাদের বর্তমান জিনোমের (মানবদেহের প্রতিটি কোষের বিদ্যমান সমস্ত জিন বা জেনেটিক রসদের সেটকে একত্রে জিনোম বলা হয়) খুব সামান্য অংশের ডিএনএ এসেছে নিয়ান্ডারথাল এবং দেনিসোভান মানুষদের কাছ থেকে তাই স্যাপিয়েন্সদের সাথে অন্য প্রজাতির মানুষের মিশেল হয়েছিল এরকম সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

স্যাপিয়েন্সদের সাথে অন্যান্য মানুষের পার্থক্য এমন বেশি কিছু ছিল না যে তাদের মধ্যে মিলনের ফলে প্রজননক্ষম সন্তান জন্ম দেয়া একেবারেই অসম্ভব ছিল। তবু অতটুকু তারতম্যের ফলেই এদের মধ্যে মেলামেশার বিষয়টা বিরল হয়ে পড়েছিল।

তাহলে জীববিদ্যায় স্যাপিয়েন্স, নিয়ান্ডারথাল এবং দেনিসোভান মানুষদের মধ্যের সম্পর্কটা কেমন?

তারা যে ঘোড়া আর গাধার মত পুরোদস্তুর ভিন্ন প্রজাতির সদস্য ছিল না এ ব্যাপারটা স্পষ্ট। অন্যদিকে, এরা বুলডগ বা স্প্যানিয়েল কুকুরের মত একই প্রজাতির ভিন্ন জাত ছিল এটাও বলা যায় না। জীববিদ্যার বাস্তবতা সাদা আর কালোতে শেষ নয়। দুটোর মাঝে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ধুসর অঞ্চল আছে এখানে।

ঘোড়া এবং গাধার মত যারা একই পূর্বপুরুষ থেকে বিবর্তিত হয়ে এসেছে তারা একসময় একই প্রজাতির ভিন্ন ভিন্ন জাত ছিল। অনেকটা এখনকার বুলডগ বা স্প্যানিয়েলের মত। বিবর্তনের গতিপথে এমন একটা সময় ছিল যখন দুটো জাত নানান দিক দিয়ে ভিন্ন হবার পরও তাদের মধ্যে মিলনের ফলে প্রজননক্ষম সন্তান জন্ম দেয়া সম্ভব ছিল। তারপর একসময় ডিএনএতে আরেকটা মিউটেশন ঘটলে তাদের মধ্যে শেষ সংযোগটাও ছিন্ন হল। যার পর থেকে ভিন্ন ভিন্ন পথেই তারা বিবর্তিত হতে থাকলো।

বলা যায় ৫০,০০০ বছর আগে স্যাপিয়েন্স, নিয়ান্ডারথাল আর দেনিসোভান মানুষেরাও সেই সীমারেখায় এসে পৌঁছেছিল। পুরোপুরি না হলেও প্রায় ভিন্ন, স্বতন্ত্র প্রজাতিতে পরিণত হয়েছিল তারা। নিয়ান্ডারথাল আর দেনিসোভান মানুষদের থেকে স্যাপিয়েন্সরা এরই মধ্যে অনেকখানি আলাদা হয়ে গিয়েছিল।

 

নিয়ান্ডারথাল শিশু

চেহারার অনুমানমূলক পুনঃ নির্মাণ (speculative reconstruction) এর পর নিয়ান্ডারথাল শিশু। নিয়ান্ডারথালদের কিছু অংশ যে সাদা চামড়ার ছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায় জেনেটিক প্রমাণাদি থেকে

 

পার্থক্য তৈরি হয়েছিল জেনেটিক সংকেত আর শারীরিক বৈশিষ্ট্যে। বৌদ্ধিক (cognitive) এবং সামাজিক দক্ষতার দিক দিয়েও স্যাপিয়েন্সদের সাথে বাকিদের দারুণ ফারাক তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এত কিছুর পরও  কদাচিৎ স্যাপিয়েন্স আর নিয়ান্ডারথালের মিলনের ফলে উর্বর সন্তান জন্ম দেয়া একেবারে অসম্ভব ছিল না।

এই দুইরকম মানুষ পুরোপুরি মিশ খায় নি কিন্তু কিছু ভাগ্যবান নিয়ান্ডারথাল জিন এই ফাঁকে স্যাপিয়েন্স জিনোমে ঢুকে পড়েছিল। এটা ভাবতে অস্বস্তি লাগে আবার রোমাঞ্চকরও মনে হয় যে, একসময় আমরা স্যাপিয়েন্সরা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা প্রজাতির প্রাণীর সাথে শারীরিকভাবে মিলিত হয়ে বাচ্চাকাচ্চা জন্ম দিতে পারতাম।

কিন্তু নিয়ান্ডারথাল, দেনিসোভান আর বাকি প্রজাতির মানুষেরা যদি স্যাপিয়েন্সদের সাথে মিশে গিয়ে না থাকে তাহলে তারা মিলিয়ে গেল কেমন  করে?

একটা সম্ভাবনা হল হোমো স্যাপিয়েন্সরাই আর সব মানুষদের বিলুপ্তির পথে ঠেলে দিয়েছিল। ধরা যাক, স্যাপিয়েন্সদের একটা দল ঘুরে ঘুরে এক সময় হাজির হল বল্কান উপত্যকায়। হাজার হাজার বছর ধরে নিয়ান্ডারথালরা সেখানে বসবাস করছে।

 

বল্কান অঞ্চল

বল্কান অঞ্চল

 

কিছুদিন না যেতেই উড়ে এসে জুড়ে বসা এই লোকগুলো সেখানকার হরিণ শিকার করতে শুরু করলো। পাশাপাশি বাদাম, শস্যদানা আর ফলমূল সংগ্রহও চলতে থাকল। এগুলো ছিল নিয়ান্ডারথালদের প্রধান খাদ্য। প্রযুক্তি আর সামাজিক দক্ষতার দিক থেকে এগিয়ে থাকা স্যাপিয়েন্সরা ছিল নিপুণ শিকারি এবং সফল সংগ্রাহক। অল্প দিনেই স্যাপিয়েন্সরা সংখ্যায় বাড়তে শুরু করল। আর ছড়িয়ে পড়লো গোটা উপত্যকায়।

সংখ্যা আর সামাজিকতায় পিছিয়ে থাকা নিয়ান্ডারথালদের পক্ষে খেয়ে-পরে টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়লো। ফলে নিয়ান্ডারথাল মানুষদের সংখ্যা কমতে থাকল ক্রমশ। তারপর একসময় পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গেল। কেবল যেসব নিয়ান্ডারথাল মানুষেরা তাদের প্রতিবেশি স্যাপিয়েন্সদের দলে মিশে গিয়েছিল তারাই থেকে গেল।

 

সময়ের সাথে সাথে নিয়ান্ডারথালদের অধ্যুষিত এলাকা হ্রাস পায়

সময়ের সাথে সাথে নিয়ান্ডারথালদের অধ্যুষিত এলাকা হ্রাস পায়

 

বিলুপ্তির আরেকটি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বল্কান উপত্যকায় আবাস এবং খাদ্যের প্রতিযোগিতা এমন ভয়াবহ পর্যায়ে গিয়ে ঠেকল যে তা রুপ নিল সহিংসতা আর গণহত্যায়। অসহিষ্ণু বলে স্যাপিয়েন্সদের কুখ্যাতি আছে এমনিতেও। আধুনিক যুগেও আমরা দেখতে পাই গায়ের রঙ, মুখের বুলি কিংবা ধর্মীয় আচারে সামান্য পার্থক্য দুদল স্যাপিয়েন্সের মধ্যে কিভাবে রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা-হাঙ্গামা বাঁধিয়ে দেয়।

 

মুখোমুখি দেনিসোভান এবং স্যাপিয়েন্সরা

মুখোমুখি দেনিসোভান এবং স্যাপিয়েন্সরা

 

তাহলে প্রাচীন স্যাপিয়েন্সরা কি সম্পূর্ণ ভিন্ন আরেক প্রজাতির মানুষের প্রতি বেশি সহনশীল ছিল? বরং এমন হতে পারে, যখন স্যাপিয়েন্স আর নিয়ান্ডারথালরা মুখোমুখি হল তখন ইতিহাসের সর্বপ্রথম আর সব থেকে তাৎপর্যপূর্ণ জাতিগত সহিংসতা এবং গণহত্যাটি সংঘটিত হয়েছিল।

যেভাবেই হোক না কেন নিয়ান্ডারথাল (এবং অন্যান্য প্রজাতির) মানুষের বিলুপ্তির বিষয়টি ইতিহাসকে বিরাট সব প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। যদি হোমো স্যাপিয়েন্সের সাথে নিয়ান্ডারথাল আর দেনিসোভান মানুষেরাও এই সময়ে ঠিকঠাক টিকে থাকত তাহলে ব্যাপারটা কেমন হত? একাধিক ভিন্ন প্রজাতির মানুষ যদি পাশাপাশি সহাবস্থান করতো তাহলে সমাজ, সংস্কৃতি আর রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে উঠত কিভাবে? কেমন হত তার স্বরুপ?

ধর্মীয় বিশ্বাসের কথাই ধরা যাক। ধর্মগুলো কি একই রকম থাকত? নিয়ান্ডারথালরা আদম-হাওয়ার সন্তান এই বলে কি বুক অব জেনেসিস এ লেখালেখি হত? দেনিসোভানদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতেই কি যীশুকে শূলে চরানো হত? জান্নাতে কি সকল প্রজাতির সৎ, পুণ্যবান মানুষ প্রবেশাধিকার পেত?

নিয়ান্ডারথালরা কি শক্তিমান রোমান সেনাদলে নাম লেখাতে পারত? নাকি জায়গা করে নিতে পারত সাম্রাজ্যবাদী চীনের বিস্তৃত আমলাতন্ত্রের কুলুঙ্গিতে? হোমো গণের অন্তর্ভুক্ত সব মানুষ সমান – এমন কোন আপ্তবাক্য কি লেখা হত মার্কিন স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে? কার্ল মার্ক্স কি দুনিয়ার সকল প্রজাতির মজদুর, মেহনতি মানুষকে এক হবার ডাক দিতেন?

গত ১০,০০০ বছর ধরে আমরা স্যাপিয়েন্সরা নিজেদেরকে পৃথিবীর একমাত্র মানুষের প্রজাতি হিশেবে দেখতে, ভাবতে এতোটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি যে তার বাইরে কিছু কল্পনা করা আমাদের পক্ষে অসম্ভব। অন্যান্য প্রজাতির মানুষগুলো না থাকায় দুটো জিনিস ঘটল। প্রথমত, ‘সৃষ্টির সেরা জীব’ এর তকমা গায়ে জড়াতে স্যাপিয়েন্সদের কোন বেগ পেতে হল না। দ্বিতীয়ত, স্যাপিয়েন্সদের সাথে প্রাণীজগতের বাদবাকি প্রাণীদের ব্যবধান ব্যাপক – এই বলে ঢোল পেটানোতেও বাধা রইল না।

আর সবার মত হোমো স্যাপিয়েন্সরাও যে এক রকমের প্রাণী, বিশেষ বা আলাদা কিছু নয় এই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন প্রথম চার্লস ডারউইন। তাঁর এরকম মতামত নিয়ে দারুণ তোলপাড় হয়েছিল তখন। কটাক্ষ আর বিদ্রুপের ঝড়ে কোণঠাসা হয়েছিলেন ডারউইন। দেড়শ বছর পরও এখনকার বেশিরভাগ মানুষ ডারউইনের এ তত্ত্ব মেনে নিতে নারাজ।

নিয়ান্ডারথাল মানুষেরা টিকে থাকলে আমরা কি নিজেদের ভিন্ন, অনন্য সৃষ্টি বলে ভাবার ফুসরত পেতাম? হতে পারে ঠিক এ কারণেই আমাদের পূর্বপুরুষরা কচুকাটা করে নিয়ান্ডারথালদের নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল। এত দিক থেকে নিয়ান্ডারথালরা স্যাপিয়েন্সদের মত ছিল যে তাদেরকে এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব ছিল। আবার এতোটাই আলাদা ছিল যে তাদেরকে মেনে নেয়াও সম্ভব ছিল না।

স্যাপিয়েন্সরা যখনই নতুন কোন জায়গায় হাজির হয়েছে তার ক’দিন বাদেই সেখানের স্থানীয় অধিবাসীরা বিলুপ্তির পথে হারিয়ে গেছে। ৫০,০০০ বছর আগেও যে হোমো সলোয়েনসিস মানুষেরা বেঁচে ছিল তার প্রমাণ মিলেছে সর্বশেষ পাওয়া জীবাশ্ম থেকে। তার কিছুদিন পরই হোমো দেনিসোভা মানুষ বিলুপ্ত হল। আনুমানিক ৩০,০০০ বছর আগে নিয়ান্ডারথাল মানুষেরাও হারিয়ে গেল পৃথিবী থেকে। আর ১২,০০০ বছর আগে ফ্লোরেস দ্বীপের শেষ বামুন মানুষটিও নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলে একলা আমরাই থেকে গেলাম।

আমাদের সহোদর সবকটা প্রজাতি কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। রয়ে গেছে তাদের কিছু হাড়গোড়, পাথুরে হাতিয়ার আর কিছু জিন আমাদের ডিএনএতে। তারা রেখে গেছে উত্তর না জানা কত শত প্রশ্ন। আর রেখে গেছে মানুষের একমাত্র, শেষ প্রজাতি হোমো স্যাপিয়েন্সকে, আমাদের।

স্যাপিয়েন্স মানুষদের সফলতার রহস্য কি তাহলে? কিভাবে এত কম সময়ে, এতগুলো ভিন্ন ভৌগোলিক পরিবেশে আবাস গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছিল আমাদের পক্ষে? কেমন করে আমরা অন্যান্য প্রজাতির মানুষদের বিলুপ্তি, বিস্মৃতির দিকে ঠেলে দিয়েছিলাম? শীতল জলবায়ুতে দিব্যি অভ্যস্ত, বুদ্ধিমান এবং বলিষ্ঠ গড়নের নিয়ান্ডারথাল মানুষেরাও কেন আমাদের আক্রমনের সামনে মুখ থুবড়ে পড়েছিল? বিতর্ক তীব্র হতে থাকে।

যার সম্ভাব্য সমাধান একটাই – ভাষা, ঠিক এই বিতর্কটা ঠিক যার উপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে। তার অনন্য ভাষার বদৌলতেই হোমো স্যাপিয়েন্স পুরো পৃথিবীকে জয় করেছিল।

মন্তব্য করুন

×