স্যাপিয়েন্সঃ মানবজাতির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস (৪) – রাঁধুনি জাতির গল্প

২০ জুলাই ২০১৭ দেবাশীষ সরকার ও অঙ্গার ৩৬৭

বই-পত্র , , , ,

রাঁধুনি জাতির গল্প

(A Race of Cooks)

 

মানবজাতির এই শিখরে উঠার পথে একটি তাৎপর্যময় ধাপ ছিল আগুন পোষ মানানো। ৮ লাখ বছর আগেও মানুষের কয়েকটা প্রজাতি কখনোসখনো আগুন ব্যবহার করতো। আর তিন লক্ষ বছর আগে থেকে হোমো ইরেক্টাস, হোমো নিয়ান্ডারথালস ও আমাদের পূর্বপুরুষেরা নিয়মিতভাবেই আগুনকে কাজে লাগাতে শুরু করেছিল। আগুন ছিল রাতের অন্ধকারে আলো এবং শীতে উষ্ণতার নির্ভরযোগ্য একটি উৎস। সেই সাথে শিকারের লোভে ঘুরঘুর করতে থাকা হিংস্র সিংহের দল থেকে বাঁচার কার্যকরী অস্ত্রও ছিল আগুন।

 

আগুনের আদিম ব্যবহার

আগুনের আদিম ব্যবহার

 

কিছুদিন পর মানুষ পরিকল্পিতভাবেই তার বসতির আশপাশের এলাকাও জ্বালিয়ে সাফ করে দিতে লাগলো। সাবধানে মেপেচিপে আগুন ব্যবহার করলে দুর্গম ঝোপ জঙলা পুড়িয়ে সহজেই খাসা তৃণভূমি বানিয়ে ফেলা সম্ভব। যেখানে কদিন বাদেই উপাদেয় সব শিকারেরা ঘুরে বেড়াবে অবাধে। তাছাড়া আগুন থেমে গেলে পুড়ে-ছাই বনের ভেতর হানা দিত ঝানু আদিম মানুষেরা। সেখান থেকে তুলে আনত পোড়া আলু, ওল, বাদাম কিংবা ঝলসে কাবাব হয়ে যাওয়া কোন জন্তুর মৃতদেহ।

 

...পরিকল্পিতভাবেই আগুন দিয়ে মানুষ তার বসতির আশেপাশের এলাকা জ্বালিয়ে সাফ করে দিত...

…পরিকল্পিতভাবেই আগুন দিয়ে মানুষ তার বসতির আশেপাশের এলাকা জ্বালিয়ে সাফ করে দিত…

 

আগুনের সবচেয়ে মোক্ষম ব্যবহার ছিল রান্নায়। ধান, গম, আলু ইত্যাদি যেসব খাবার মানুষ স্বাভাবিক অবস্থায় হজম করতে পারতো না সেগুলোই রান্নার যাদুতে হয়ে উঠলো প্রধান খাদ্য। আগুন আমাদের খাদ্যে রাসায়নিক পরিবর্তন আনে। খাদ্যের জৈবিক গুণাগুণকেও দেয় বদলে। তার উপর খাবারের মধ্যে যেসব পরজীবী, জীবাণু থাকে তাপে রান্নার কারণে সেসব ধ্বংস হয়ে যায়।

রান্নার কারণে মানুষের পুরোনো প্রিয় খাবার গুলো যেমন ফলমূল, বাদাম, পোকামাকড় আর জন্তু জানোয়ারের মাংস নরম হল। যার ফলে চিবিয়ে হজম করতে কসরত করতে হতো কম। কাঁচা খাবার চিবানোর পেছনে শিম্পাঞ্জি সারাদিনে ৫ ঘণ্টা ব্যয় করে। সেখানে রান্না করা খাবার খেতে দিনে মাত্র এক ঘণ্টাই যথেষ্ট মানুষের বেলায়।

 

মস্তিষ্কের আকার এবং চোয়ালের আকারের সম্পর্ক

মস্তিষ্কের আকার এবং চোয়ালের আকারের সম্পর্ক

 

রান্নার সুবিধার কারণে মানুষের খাবারদাবারে বৈচিত্র্য আসে। খেতেও সময় খরচ হতো কম। আর রান্নার ফলে খাবার নরম এবং সুপাচ্য হওয়ায় ছোট দাঁত এবং আকারে ছোট, খাটো অন্ত্র দিয়েই কাজ চালানো সম্ভব হয়েছিলো। কিছু গবেষক মনে করেন রান্নার আবির্ভাবের সাথে অন্ত্রের (ক্ষুদ্রান্ত্র ও বৃহদান্ত্র) খাটো হয়ে যাওয়া আর মানব মস্তিষ্কের আকার বৃদ্ধি পাওয়ার মধ্যে সরাসরি একটা সংযোগ আছে

 

মস্তিষ্ক এবং পরিপাকতন্ত্রের সম্পর্ক

মানুষের অন্ত্রও মস্তিষ্কের মতো অনেক বেশি শক্তি শরীর থেকে শুষে নেয়, তাই সহজপাচ্য খাবারের কারণে হজম অনেক সহজ গেলে অন্ত্রের কাজ কমে যায়, ফলে অন্ত্রের দৈর্ঘ্য ক্রমে হ্রাস পায় এবং মস্তিষ্ক বিকাশের পথ সুগম করে দেয়

 

দীর্ঘ অন্ত্র এবং মস্ত মস্তিষ্ক উভয়ের পেছনে শরীরের শক্তি খরচা হয় বেশি। তাই একসাথে দুটোকে বয়ে বেড়ানো অনেক ঝক্কির ব্যাপার। রান্নায় অভ্যস্ত হয়ে গেলে অন্ত্রের দৈর্ঘ্য কমে যেতে থাকে ফলে শক্তি ব্যয় কমে যায় ক্রমশ। অন্যদিকে মস্তিষ্কের দিকে শক্তির যোগান বৃদ্ধি পায় যা নিয়ান্ডারথ্যাল ও স্যাপিয়েন্সকে বিরাট মস্তিষ্কের মালিক হওয়ার সুযোগ করে দেয়।

আগুনই প্রথম মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণীদের মধ্যে সাগরসম ব্যবধানের সৃষ্টি করে। বেশিরভাগ প্রাণীই দৈহিক ক্ষমতার উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। তারা পেশির শক্তি, দাঁতের আকৃতি আর চওড়া ডানাকে পুঁজি করে বেঁচে থাকে। একটুআধটু বাতাস আর পানির স্রোতকে কাজে লাগালেও এসব প্রাকৃতিক শক্তিকে নিয়ন্ত্রনে আনা তাদের সাধ্যের বাইরে। আরেকটি বিষয় হল শরীরের গঠনগত সীমাবদ্ধতা এরা কখনোই কাটিয়ে উঠতে পারে না।

যেমন তাপ স্তম্ভের কথাই ধরা যাক। সূর্যের তাপে বায়ু উষ্ণ হলে তা হালকা হয়ে উপরের দিকে উঠতে থাকে। এর ফলে ঊর্ধ্বগামী উষ্ণ বাতাসের একটি স্তম্ভ তৈরি হয়। এটাই তাপ স্তম্ভ (Thermal Column)। ভূপৃষ্ঠ থেকে উপরের দিকে উঠতে থাকা এরকম তাপ স্তম্ভগুলো ঈগল ঠিকঠাক সনাক্ত করতে পারে। সেখানে গিয়ে ঈগল শুধু তার বিশাল ডানা মেলে ধরে আর ঊর্ধ্বগামী গরম বাতাসের উপর ভর করে উঁচু থেকে উঁচুতে উঠতে থাকে।

 

তাপ স্তম্ভ

তাপ স্তম্ভঃ অনেক লম্বা ডানার এক রকমের প্লেন আছে যেগুলো তাপ স্তম্ভকে কাজে লাগিয়ে বাতাসে ভেসে থাকে

 

তারপরও ভূপৃষ্ঠের ঠিক কোন জায়গায়, কখন এই তাপ স্তম্ভ গজাবে তা একটা ঈগল নিয়ন্ত্রন করতে পারে না। আর এভাবে ভেসে বেড়ানোর ক্ষমতা তার ডানার বিস্তারের সমানুপাতিক। অর্থাৎ বিশাল ডানা হলে ভেসে বেড়ানোর ক্ষমতা বেশি, আর ডানা ছোটো হলে ক্ষমতাও কম।

আগুনকে বশে আনার ফলে সীমাহীন শক্তির সম্ভাবনাময় একটি উৎস মানুষের নিয়ন্ত্রনে এলো। মানুষ যখন যেমন খুশি আগুন জ্বালিয়ে নিতে পারত। একটা নয় বরং নানান প্রয়োজনে আগুন ব্যবহার করতে শিখে গিয়েছিল মানুষ। এখানেই ঈগলের সাথে মানুষের ফারাক। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল মানুষের দেহের আকার, গড়ন কিংবা গায়ের জোরের উপর আগুনের ক্ষমতা নির্ভর করতো না। একজন মাত্র নারী শুধু পাথর ঠুকে বা জ্বলন্ত একটা কাঠি দিয়েই আস্ত বন পুড়িয়ে ছাই করে ফেলতে পারত। তাও মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যাবধানে।

আগুন আবিষ্কার ও নিয়ন্ত্রন অনেক কিছুর আগাম বার্তা নিয়ে এসেছিল।

 

 

মন্তব্য করুন

×