সেপিয়েন্সঃ মানবজাতির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস (৩) – চিন্তার মাশুল

চিন্তার মাশুল

 (The Cost of Thinking)

 

কিছু তফাৎ থাকা সত্ত্বেও সব প্রজাতির মানুষের মধ্যেই কিছু সাধারণ শনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য ছিল। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল- মস্তিস্কের আকার। আর সকল প্রাণীর তুলনায় মানুষের মস্তিস্ক ছিল ঢের বড় সাইজের। ৬০ কেজি ওজনের স্তন্যপায়ীদের ব্রেইনের গড় আকার ২০০ ঘন সেন্টিমিটার (সিসি) হয়ে থাকে। সেখানে ২৫ লাখ বছর আগের একেবারে আদিম মানুষের মস্তিস্কের আয়তন ছিল ৬০০ সিসি। আর আধুনিক মানুষ ১২০০ – ১৪০০ সিসি আকারের মস্তিষ্ক নিয়ে বড়াই করে খুব। নিয়ান্ডারথালদের ব্রেইন ছিল আরও বড়

 

মানুষ ও শিম্পাঞ্জীর মস্তিষ্কের আকারের তুলনা

চোয়ালের আকারের সাথে মস্তিষ্কের আকারের একটা সম্পরক রয়েছে, শিম্পাঞ্জীর চোয়াল বড় কিন্তু মস্তিষ্ক ছোটো আর মানুষের বেলায় উল্টো। আরেকটি বড় পার্থক্য আছে, মানুষের ব্রেইনের যে অংশটি কপালের ভুরুর উপরের দিকে অবস্থান করছে সে অংশটি শিম্পাঞ্জীর ক্ষেত্রে বলতে গেলে অনুপস্থিত। এ জায়গাটার নাম ফ্রন্টাল লোব।

 

বিবর্তনের ফলে বৃহৎ মস্তিস্কই যে আসবে এ ব্যাপারটা আমরা খুব সহজভাবে মেনে নিয়েছি। নিজেদের উঁচু বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আমরা যার পর নাই পুলকিত। আমরা ধরে নিয়েছি, ব্যাপারটা যখন মস্তিষ্কের ক্ষমতা তখন অধিক মানেই উত্তম।

 

মস্তিষ্কের আকারের বিবর্তন

দীর্ঘ বিবর্তনের পর মানুষের মস্তিষ্ক বর্তমান আকারে এসেছে। তবে গত ১০ লক্ষ বছরের মধ্যেই আকার বেড়েছে দ্বিগুন

 

যদি সত্যিই তাই হত তাহলে বিড়ালের গোত্রে হয়ত এদ্দিনে ক্যালকুলাসে চৌকস কোন চিতাবাঘ জন্ম নিত। ব্যাঙেরাও হয়ত এরই মধ্যে মহাকাশে পাড়ি দিতে নিজেদের স্পেস প্রোগ্রাম চালু করে বসত। তাহলে প্রশ্ন হল, বিরাট মস্তিষ্ক প্রাণীজগতে এত বিরল কেন?

বড়সড় ব্রেইন মানে শরীরের বড়সড় দায়ভারও। বিশেষ করে এই বিরাট মস্তিষ্ক যখন তারচেয়ে দশাসই একটা খুলির মধ্যে বসানো থাকে তখন একে নিয়ে হাঁটাচলা করাও দুরূহ ব্যাপার। মস্তিষ্কের জন্য শক্তির যোগান দেয়া তারচেয়েও কঠিন। হোমো সেপিয়েন্সদের মস্তিষ্কের ওজন তার সমস্ত শরীরের ওজনের মাত্র ২ কি ৩%। অথচ বিশ্রামকালীন সময়ে ব্রেইন পুরো শরীরের দরকারি শক্তির ২৫% একলাই শুষে নেয়। সে তুলনায় অন্য এপদের বেলায় ব্রেইনের পেছনে খরচা পড়ে বিশ্রামকালীন শক্তির মাত্র ৮% ।

 

মানব মস্তিষ্কের বিবর্তন

মানব মস্তিষ্কের বিবর্তন

 

বড় মস্তিষ্কের কারণে দুভাবে মাশুল গুনতে হয়েছিল প্রাচীন মানুষদের। প্রথমত, খাবারের খোঁজে তাদেরকে অনেক বেশি সময় ব্যয় করতে হত। দ্বিতীয়ত, তাদের মাংসপেশিগুলো ক্রমশ ক্ষয়ে গিয়ে কিছুটা চুপসে গিয়েছিল। বাইসেপস পেশি থেকে মস্তিষ্কের নিউরনের দিকে শক্তির সরবরাহকে পাল্টে দিয়েছিল মানুষ। যেমন করে কোন সরকার প্রতিরক্ষা থেকে অর্থ সরিয়ে এনে শিক্ষায় ব্যয় করে অনেকটা সেরকম।

আফ্রিকার সাভানায় টিকে থাকার জন্য এটা যে মোক্ষম কোন কৌশল ছিল তা বলা যায় না। তর্কে একটা শিম্পাঞ্জী মানুষের সাথে পেরে উঠবে না। কিন্তু কাপড়ের পুতুলের মত মানুষকে ঠিকই টেনে ছিঁড়ে ফেলার শক্তি রাখে সে।

আজকে বৃহৎ মস্তিষ্ক থাকার সুফল ভোগ করছি আমরা পুরোদমে। গাড়ি আবিষ্কার করেছি আমরা, যার কেরামতিতে শিম্পাঞ্জীকে কাঁচকলা দেখিয়ে দৌড়ে হারিয়ে দিয়েছি। তৈরি করেছি নিখুঁত সব মারণাস্ত্র। কোনরকম কুস্তি না লড়ে যা দিয়ে নিরাপদ দূরত্বে থেকে গুলি ছুঁড়তে পারি আগ্রাসী শিম্পাঞ্জীর দিকে। কিন্তু বন্দুক, গাড়ি তো এই সেদিনের কথা।

 

মস্তিষ্কের নিউরাল নেটওয়ার্ক

নিউরন মস্তিষ্কের গঠন এবং কাজের একক। মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলের নিউরন একে অপরের সাথে সংযুক্ত হয়ে অসম্ভব জটিল এক প্রকার 3D জাল তৈরি করে যা নিউরাল নেটওয়ার্ক নামে পরিচিত।

 

২০ লক্ষ বছর ধরে মানব মস্তিষ্কে নিউরনের নেটওয়ার্ক বেড়ে বিস্তৃত হয়েছিল অনেক। তারপরও পাথুরে ছোরা, সূচালো লাঠি ছাড়া আহামরি মুল্যবান কিছু দিতে পারেনি প্রাচীন মানুষ। তাহলে কি ঘটেছিল সেই ২০ লাখ বছরে যার ফলে দীর্ঘ বিবর্তনের ভেতর দিয়ে মানুষ তার বিরাট মস্তিষ্কের মালিক হল?

এ প্রশ্নের উত্তর আমাদের আসলেই জানা নেই।

 

আফ্রিকান সাভানা

আফ্রিকান সাভানা

 

মানুষের আরেকটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হল দুপায়ে ভর দিয়ে সটান সোজা হয়ে চলাফেরার ক্ষমতা। উঠে দাঁড়ালে সাভানায় শিকার খোঁজা বা শত্রুকে চোখে চোখে রাখার কাজটা সহজ হয়ে যায়।

 

সাভানায় শিকার

সাভানের লম্বা ঘাসের আড়ালে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকে শিকারী জন্তুরা। চিতা বাঘটাকে দেখতে পেয়েছেন?

 

দাঁড়িয়ে দুপায়ে চলতে গেলে হাতের আর কোন দরকার পড়ে না। ফলে অন্য কাজে হাতকে ব্যবহার করার  সুযোগ মেলে যেমন- পাথর ছুঁড়ে মারতে কিংবা ইশারা দিতে।

বেশি বেশি হাতের কাজে যারা পারদর্শী হল তারাই সফলতা পেলো বেশি। যদি কোন বিশেষ অঙ্গ একটি প্রাণীকে টিকে থাকার দৌড়ে এগিয়ে রাখে তাহলে সে অঙ্গটি বিবর্তনের কারণে বিশেষত্ব পেতে থাকে। মানুষের বেলায় বিবর্তনের কারণে হাতের তালু ও আঙ্গুলের ছোটো মাংসপেশিগুলো সুসমন্বিত হয়ে উঠলো। পাশাপাশি আঙ্গুল, হাতের তালুতে অধিক সংবেদনশীলতার জন্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্নায়ুতন্তুর (nerve fiber) সমাবেশ বাড়তে থাকলো। এসবের কারণেই মানুষ এখন হাতের সাহায্যে অত্যন্ত জটিল কাজকর্ম করতে পারে অনায়াসে।

 

মানুষের হাত বনাম গরিলার হাত

শিম্পাঞ্জী বা গরিলার হাত অনেক বড় আর শক্তিশালী কিন্তু মানুষের মত এত সূক্ষ্ম কাজ করতে তারা অক্ষম

 

বিশেষত, সূক্ষ্ম আর জটিল সব হাতিয়ার তৈরি আর ব্যবহারে মানুষের কোন জুড়ি নেই। মানুষের হাতিয়ার তৈরির সবচেয়ে প্রাচীন যে নিদর্শন সেটা ২৫ লক্ষ বছর পুরনো। এই হাতিয়ারের উৎপাদন আর ব্যবহারের নমুনা দেখে প্রাচীন মানুষদের সনাক্ত করেন প্রত্নতত্ত্ববিদরা।

 

মানুষের তৈরি প্রাচীনতম হাতিয়ার

পাথরের তৈরি হাত-কুঠার মানুষের তৈরি সবচেয়ে প্রাচীন হাতিয়ারগুলোর অন্যতম

 

সোজা হয়ে দুপায়ে হাঁটার কিছু অসুবিধাও ছিল। আমাদের পূর্বপুরুষ প্রাইমেটদের কঙ্কাল বিকশিত হয়েছে লক্ষ লক্ষ বছরের বিবর্তনের পরে। ছোটো মাথার চারপেয়ে একটা জন্তুর ভার বইবার জন্যে এই কঙ্কাল বিকশিত হয়েছিল। তাই সটান খাড়া অবস্থায় মানিয়ে নিতে পারাটা একটা ব্যাপক চ্যালেঞ্জ ছিল কেননা মস্ত একটা করোটির ভার বইতে হত কঙ্কালকে। এভাবে ঘাড়ব্যাকা, পিঠব্যথা এ দুটো অসুখ মানুষ তার চমৎকার দৃষ্টিশক্তি এবং পরিশ্রমী হাত দুটোর সাথে ফ্রীতেই পেয়েছে।

 

দুপায়ে চলাফেরার কারণে কঙ্কালতন্ত্রের পরিবর্তন

দুপায়ে সোজা হয়ে চলাফেরার কারণে মানুষের কটিদেশ সংকীর্ণ আর ছোটো হয়ে যায়

 

নারীদের বেলায় আরও চড়া মাশুল গুনতে হয়েছিল। সোজা হয়ে চলাফেরা করতে হলে কটিদেশ সংকীর্ণ হতে হয়। এর ফলে যোনি পথ (Birth canal) সংকুচিত হয়ে যায়।

 

 

এই পরিবর্তনগুলো নারীদেহে স্থায়ী হতে শুরু করে এমন সময়ে যখন নবজাতকদের মাথা আকারে ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছিল। সব মিলিয়ে প্রসবকালীন জটিলতার কারণে মৃত্যুর কবলে পড়লেন অসংখ্য আদিম মানবী।

 

প্রিম্যাচিউর বেবী বা অপরিণত নবজাতক

অপরিণত নবজাতকদের মাথা, হাত পা পুরো শরীর সাধারণ নবজাতকদের তুলনায় অনেক ছোটো হয়। আদিম মানবীর সংকুচিত যোনিপথ দিয়ে এইরকম ক্ষুদ্র, অপরিণত নবজাতকেরই জন্ম হওয়া সম্ভব ছিল

 

পূর্ণ গর্ভকালীন সময়ের আগে বাচ্চার মাথা আকারে তুলনামূলকভাবে ছোটো আর নমনীয় থাকে। যে কারণে সাধারণ গর্ভধারণকাল পূর্ণ হবার আগে আগে যে আদিম মানবীরা সন্তান জন্ম দিয়েছিলেন তারা প্রসবকালীন কোন জটিলতায় পড়েননি। এরাই টিকে থাকলেন আর বংশবিস্তার করে গেলেন। প্রাকৃতিক নির্বাচনের ফলে এভাবে পূর্ণ গর্ভকালীন অবস্থায় পৌঁছার আগেই অকালে, অপরিণত অবস্থায় বাচ্চা জন্ম দেয়ার ব্যাপারটা প্রতিষ্ঠা পেলো।

সত্যিকার অর্থেই, অন্যান্য প্রাণীদের তুলনায় মানব শিশু জন্মগ্রহন করে একেবারে অপরিণত, নাজুক অবস্থায়। জন্মের সময় মানব শিশুর বেশিরভাগ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গই অবিকশিত থাকে। সেখানে সদ্য জন্মানো একটি ঘোড়া শাবক কিছুক্ষণ বাদেই ছোটাছুটি আরম্ভ করে দেয়।

 

সদ্য জন্ম নেয়া ঘোড়া শাবক

ঘোড়া শাবকরা জন্মের কিছুক্ষণ বাদেই ছোটাছুটি শুরু করে দেয়

 

কয়েক সপ্তাহ বয়েস হলে বেড়ালছানারা তাদের মাকে ফেলে নিজেরাই খাবারের খোঁজে নেমে পড়ে। মানবশিশুরা এদিক থেকে নিতান্ত অসহায়। জন্মের পর বহু বছর পর্যন্ত মানবশিশু খাবারদাবার থেকে আরম্ভ করে শিক্ষা, সুরক্ষা সবকিছুর জন্যে বড়দের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল থাকে।

এ বিষয়টি মানুষের অসাধারণ সামাজিক প্রতিভা বিকাশে যেমন অবদান রেখেছে তেমনি মানুষের সমাজে অনন্য সব সমস্যারও জন্ম দিয়েছে। মায়েদের একার পক্ষে সন্তান এবং নিজের খাদ্যের যোগান দেয়া খুব কঠিন ছিল। বিশেষ করে  বাচ্চারা যখন ছোটো আর অসহায় তখন তাদের একলা ফেলে রেখে কোন কিছুই করা সম্ভব ছিল না।

প্রতিবেশি কিংবা পরিবারের অন্যদের  সার্বক্ষণিক সহযোগিতা ছাড়া সন্তান লালনপালন করা প্রায় অসম্ভব ছিল। গোষ্ঠীর সবাই মিলেমিশে বাচ্চাকাচ্চা মানুষ করত। এভাবে দৃঢ় সামাজিক বন্ধন তৈরিতে যারা সক্ষম ছিল তারাই বিবর্তিত হল। তার উপর, মানুষ অপরিণত অবস্থায় জন্মগ্রহন করে বলে অন্য যে কোন প্রাণীর তুলনায় মানুষকে ব্যাপক মাত্রায় শিক্ষিত আর সামাজিক করে তোলারও সুযোগ থাকে।

অধিকাংশ স্তন্যপায়ীদের সন্তান ভূমিষ্ঠ হয় পরিণত অবস্থায়। অনেকটা চুল্লী থেকে তুলে আনা চকচকে, শক্ত আর ব্যবহার উপযোগী মাটির পাত্রের  মত। এ পাত্রকে নতুন আদলে গড়তে চাইলে হয় তাতে আঁচড় পড়ে আর না হয় ভেঙ্গে গুড়িয়ে যায়। আর মানুষ ভূমিষ্ঠ হয় ফার্নেস থেকে নামানো গলিত কাঁচের ন্যায়। মনের মাধুরী মিশিয়ে ইচ্ছেমত ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে, কেটে, প্রসারিত করে যেমন খুশি নতুন আকৃতি দেয়া যায় তাকে। একারণেই আমরা শিশুদের খ্রিস্টান বা বৌদ্ধ, পুঁজিবাদী বা সমাজতান্ত্রিক, যুদ্ধবাজ কিংবা শান্তিপ্রিয় হবার দীক্ষা দিতে পারি।

আমরা মেনে নিয়েছি বৃহৎ মস্তিষ্ক, হাতিয়ার বা যন্ত্রের ব্যবহার, অসাধারণ শেখার ক্ষমতা আর জটিল সামাজিক কাঠামো এসব আমাদের জন্যে দারুন উপকারি। এসবের বদৌলতেই যে মানুষ পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিমান প্রাণীতে পরিণত হয়েছে তার আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু পুরো ২০ লক্ষ বছর মানুষ এই সুবিধাগুলো ভোগ করেছে। তবু সেসময় মানুষ ছিল দুর্বল এবং তুচ্ছ একটি প্রাণী।

ঢাউস সাইজের ব্রেইন, ধারালো পাথুরে হাতিয়ার থাকার পরও লক্ষ লক্ষ বছর আগে মানুষকে ঠিকই হিংস্র শিকারী জন্তুর ভয়ে সিটিয়ে থাকতে হত। কালেভদ্রে হয়ত একটা বড় শিকার জুটত। বাকিটা সময় গাছের ফলমূল সংগ্রহ করে, পোকামাকড় চিবিয়েই বেঁচে থাকতে হত। কখনো চুপিচুপি পিছু নিয়ে ছোটখাটো জানোয়ার পাকড়াও করত। আবার কখনো শক্তিশালী মাংসাশী কোন জন্তুর শিকারের উচ্ছিষ্ট খেয়েই দিনযাপন করতে হতো।

 

আদিম মানুষের জীবনযাত্রা

প্রায়শই বড় শিকারী জানোয়ারের উচ্ছিষ্ট শিকার খেয়েই আদিম মানুষদের বেঁচে থাকতে হত

 

প্রাচীন পাথুরে হাতিয়ারগুলো মূলত ব্যবহৃত হত হাড় ফাটিয়ে, ভেঙ্গে ভেতরের মজ্জাটুকু বের করে নিতে। কিছু গবেষক বিশ্বাস করেন এটাই ছিল বাস্তুসংস্থানে আমাদের আদিম অবস্থান (original niche)। কাঠঠোকরারা যেমন গাছের গুঁড়ি খুঁড়ে কীটপতঙ্গ টেনে বার করতে ওস্তাদ তেমনি হাড় ফাটিয়ে অস্থিমজ্জা শুষে নেয়া ছিল আদিম মানুষের বিশেষত্ব। কিন্তু অস্থিমজ্জা কেন?

 

হাতিয়ারের ব্যবহার

প্রাচীন পাথুরে হাতিয়ারগুলো মূলত ব্যবহৃত হত হাড় ফাটিয়ে, ভেঙ্গে ভেতরের মজ্জাটুকু বের করে নিতে

 

একটু ভেবে দেখলে বিষয়টা অনুধাবন করা যায়।

ধরা যাক, এক পাল সিংহ একটা জিরাফকে শিকার করল। দূর থেকে সেটা ঘাপটি মেরে দেখল আদিম মানুষের একটা দল। ধৈর্য নিয়ে তারা সিংহের রাজকীয় ভোজ শেষ হবার অপেক্ষায় আছে। সিংহরা সপরিপারে চলে গেলে আদিম মানুষেরা ভাবল এবার তাদের পালা। কিন্তু না! খাবারের গন্ধ পেয়ে কোত্থেকে হাজির হয়েছে হায়েনা আর শিয়ালের ঝাঁক।

 

হারামি হায়েনা

হায়েনারা দলবল নিয়ে চলে আর খুব বদ প্রকৃতির হয়। সিংহের শিকারেও এরা ভাগ বসাতে আসে!

 

এদেরকে ঘাঁটাতে সাহস হয় না আদিম মানুষের। অগত্যা চেয়ে চেয়ে দেখা। এরমধ্যে সিংহের ফেলে যাওয়া উচ্ছিষ্ট চেটেপুটে খেয়ে নিল শিয়াল আর হায়েনারা। তারা বিদায় নিলে সুযোগ এলো মানুষের। দলবল নিয়ে আদিম মানুষেরা এগিয়ে গেল জিরাফের মৃতদেহের কাছে। সতর্ক চোখে চারপাশ একবার দেখে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো হাড়সর্বস্ব মৃতদেহের উপর, খেয়ে নিল খাওয়ার মত যা কিছু অবশিষ্ট ছিল তাতে।

বিষয়টা আমাদের ইতিহাস এবং মনস্তত্ত্ব বুঝে নেয়ার জন্য অপরিহার্য। খাদ্য শৃঙ্খলে সবসময়ই ‘হোমো’ গণের অবস্থান ছিল একেবারে মাঝের কাতারে। এই অবস্থান পাল্টেছে খুব বেশি দিন হয়নি। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে মানুষ ক্ষুদে জন্তু জানোয়ার শিকার করেছে। খুঁজে খুঁজে সংগ্রহ করেছে ভোজ্য ফলমূল, লতা পাতা, বুনো সবজি এসব। আবার নিজেই শিকার হয়েছে বড় কোন শিকারী জন্তুর।

 

আদিম মানুষের শিকার এবং খাদ্য সংগ্রহ

মানুষের ইতিহাসের বেশির ভাগ সময় মানুষ শিকার ও খাদ্য সংগ্রহ করেই জীবনযাপন করেছে, বর্তমান সময়েও পৃথিবীতে বেশ কিছু আদিবাসী সমাজ আছে যেগুলো শিকার এবং সংগ্রহ অর্থনীতির উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল

 

৪ লাখ বছর আগে বেশ কিছু প্রজাতির মানুষ নিয়মিতভাবে বড় শিকার ধরতে শুরু করেছিল। আর তারপর ‘হোমো সেপিয়েন্স’ এর আবির্ভাবের সময় শুরু থেকে গত ১ লক্ষ বছরেই মানুষ উঠে গেছে একেবারে খাদ্যশৃঙ্খলের চুড়ায়।

এভাবে মাঝখান থেকে একেবারে উঁচুতে উঠে আসার ব্যাপারটা অভাবনীয় ছিল। তার প্রভাবও ছিল ব্যাপক। সিংহ বা হাঙ্গরের মত খাদ্য পিরামিডের সর্বোচ্চ স্তরের বাদবাকি প্রাণীরা লক্ষ লক্ষ বছরের বিবর্তনের পর এ অবস্থানে এসে পৌঁছেছে। যার ফলে সিংহ বা হাঙ্গরের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রনে রাখতে বাস্তুতন্ত্রের মধ্যে এক রকমের ‘নিয়ন্ত্রন ও ভারসাম্য রক্ষা’ ব্যাবস্থা এরই মধ্যে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল।

বিবর্তনের ফলে সিংহ যেমন প্রাণঘাতী হয়ে উঠলো হরিণও তেমনি দ্রুত ছুটে পালাবার ক্ষমতা অর্জন করলো। পাশাপাশি সুদীর্ঘ সময়ের বিবর্তনের ফলে হায়েনারাও দল বেঁধে মিলেমিশে শিকার করতে শিখে গেল আর রাগী গণ্ডার আরও বদরাগী হয়ে উঠলো। অন্যদিকে মানুষ এত তাড়াতাড়ি চুড়ায় পৌঁছে গিয়েছিল যে বাস্তুতন্ত্র তার সাথে মানিয়ে উঠার জন্য আর পর্যাপ্ত সময় পেলো না। তারচে’ বড় ব্যাপার হল মানুষ নিজেও ব্যর্থ হয়েছিলো খাপ খাওয়াতে।

পৃথিবীর শীর্ষ শিকারী প্রাণীদের সবাই স্বভাবে রাজকীয় গোছের। লক্ষ লক্ষ বছরের আধিপত্যের পরিণতিতে তারা হয়েছে ভরপুর আত্মবিশ্বাসী।

সে তুলনায় প্রাণীজগতে মানুষ হল দুদিনের মোড়ল। এই ক’দিন আগেও আফ্রিকান সাভানা তৃণভূমির অন্যতম হতভাগা, হারু পার্টি ছিলাম আমরা। আমাদের বর্তমান অবস্থান নিয়ে আমরা তাই দারুন শঙ্কিত, উদ্বিগ্ন। বিষয়টা আমাদের ভীষণ নিষ্ঠুর এবং বিপদজনক করে তুলেছে। ইতিহাসে বহু প্রাণঘাতী যুদ্ধ থেকে মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয় পর্যন্ত বহু কিছু ঘটেছে আমাদের এই অতি-বেপরোয়া অগ্রগতির তোড়ে।

মন্তব্য করুন

×