মেঘেদের যতো কথা

২৪ আগস্ট ২০১৬ অঙ্গার ৩,৭০০

ইশকুল , ,

মেঘ না থাকলে, বৃষ্টি না হলে বাঙালি কবিরা আধা-বোবা হয়ে যেতেন। একটা কথা প্রচলিত আছে, যদি তোমার মন খারাপ হয় তাহলে উপরে তাকিয়ে আকাশকে দেখ, মন ভালো হয়ে যাবে। ভেসে থাকা মেঘ দেখে মন ভালো হয়, মেঘ থেকে বৃষ্টি হয় আর তাতে ভাবুক-কবিদের মন ভিজে যায়। কিন্তু, কথা হোলো মেঘ ভেসে থাকে কেন? সব মেঘ থেকে কি বৃষ্টি হয়?? তারও আগের প্রশ্ন হোলো, মেঘ হয় কি করে?

 

নানান রকম মেঘ

নানান রকম মেঘ

 

আমরা যত মেঘ দেখে থাকি সেগুলো আমাদের বায়ুমণ্ডলের সর্বনিন্ম স্তর ট্রপোস্ফিয়ারেই সীমাবদ্ধ। সূর্যের তাপে পুকুর-নদী-খাল-বিল-মহাসমুদ্রের বিপুল পরিমাণ পানি প্রতিদিন বাষ্পীভূত হয়ে জলীয়বাষ্পে পরিণত হয়। উত্তপ্ত এবং হালকা জলীয়বাষ্প উপরে উঠে যেতে থাকে। বায়ুমণ্ডলের উপরের দিকে বাতাসের চাপের পরিমাণ কম আর তাপমাত্রাও থাকে অনেক নিচুতে। এই কম তাপ আর চাপের উপযুক্ত পরিবেশে জলীয়বাষ্প সম্পৃক্ত হলে তবেই মেঘ দেখতে পাওয়া যায়। সব মেঘে জলীয়বাষ্প থাকলেও সব মেঘ থেকে কিন্তু বৃষ্টি হয় না।

 

নিম্বো-স্ট্র্যাটাস

নিম্বো-স্ট্র্যাটাস

 

স্ট্র্যাটাস, মেঘের চাদর!

স্ট্র্যাটাস, মেঘের চাদর!

 

যে মেঘ থেকে বৃষ্টি হয় সেগুলোকে নিম্বাস বলে। লাতিন শব্দ nimbus এর মানে হোলো বৃষ্টি-মেঘ। নিম্বাসে অনেক বেশি জলীয়বাষ্প থাকে এবং জলকণার আকার বড়ো হওয়ায় এই মেঘগুলো কালচে-ধুসর হয়, যা ভেদ করে সূর্যের আলো আস্তে পারে না-তখনি আমরা বলি, আকাশ কালো হয়ে গেছে, বৃষ্টি নামবে। তবে নিম্বাস কোন আলাদা ধরনের মেঘ নয়। অবস্থান এবং বিশিষ্টতার ভিত্তিতে মেঘকে প্রধানত তিন ভাগে ভাগ করা হয়।  সব না হলেও ভিন্ন ধরনের একাধিক মেঘ একই সাথে আকাশে দেখতে পাওয়া যায়।

 

স্ট্র্যাটাস বা স্তর মেঘ

স্ট্র্যাটাস বা স্তর মেঘ

 

সবচে’ নিচের মেঘ হোলো স্তর মেঘ বা স্ট্র্যাটাস (strata=স্তর)। এদের উচ্চতা ৬০০০ ফুটের বেশি নয়। কোন বিশেষ আকার বা আকৃতি নেই, একটা স্তরের মতো করে থাকে এরা। স্তর মেঘ কুয়াশার মতো ধূসর যে কারণে আকাশকে ময়লা লাগে। স্তর মেঘ থেকে মৃদু বৃষ্টিপাত, তুষারপাত হয়। যে স্তর মেঘ থেকে বৃষ্টি হয় তাকে নিম্বো-স্ট্র্যাটাস বলে।

 

কিউমুলাস

কিউমুলাস

 

শরতের আকাশে পেঁজা তুলোর (বা শেভিং ফোম!) মতো ফোলা, সাদা যে মেঘ দেখা যায় সেগুলো হোলো স্তূপ মেঘ বা কিউমুলাস (cumulus=স্তূপ)। স্তূপ মেঘ স্তর মেঘের মতোই নিচু মেঘ। এই মেঘ থেকে সাধারণত বৃষ্টি হয় না। তবে অনেকসময় স্তূপ মেঘ জমা হয়ে উঁচু টাওয়ার এর মতো কিউমুলোনিম্বাস (cumulonimbus) মেঘ তৈরি করে। কিউমুলোনিম্বাস থেকে ঝড়, তীব্র বৃষ্টিপাত, টর্নেডো হবার সম্ভাবনা থাকে। কিউমুলোনিম্বাস এর বিস্তার ১০-১২ কিমি উঁচু পর্যন্ত হতে পারে।

 

কিউমুলোনিম্বাস

কিউমুলোনিম্বাস

 

নেহাই মেঘ, এক বিশেষ রকমের কিউমুলোনিম্বাস

নেহাই মেঘ, এক বিশেষ রকমের কিউমুলোনিম্বাস

 

আকাশে সবচে’ উঁচুতে থাকে অলক মেঘ বা সিরাস (cirrus)। ভূপৃষ্ঠের ৬-১২ কিলোমিটার উঁচুতে পালকের গুচ্ছের মতো পাতলা ছেড়া ছেড়া যে মেঘগুলো থাকে সেগুলোকে আবহাওয়াবিদরা বলেন সিরাস মেঘ। অলক মেঘ সাধারণত শাদা হয়ে থাকে।

 

সিরাস মেঘ

সিরাস মেঘ

 

৬১০০ মিটার উপরে জলীয়বাষ্প ঠাণ্ডা হয়ে বরফ কনায় পরিণত (সরাসরি, deposition) হলে সিরাস মেঘ আকাশে দেখা যায়। সিরাস মেঘ অনেকসময় সাইক্লোন বা প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড়ের বার্তা নিয়ে আসে। যদিও সিরাস মেঘ ঝড়ো হাওয়া, তুমুল বৃষ্টির পূর্বাভাস দেয়, সে নিজে কিন্তু কোনো বৃষ্টিপাত ঘটায় না। আসলে বৃষ্টি হয় ঠিকই কিন্তু অতো উঁচু থেকে মাটিতে পড়ার আগেই তা বাষ্পীভূত হয়ে যায়।

 

সিরাস বা অলক মেঘ

সিরাস বা অলক মেঘ

 

পালকের গুচ্ছের মতো পাতলা ছেড়া অলক মেঘ

পালকের গুচ্ছের মতো পাতলা ছেড়া অলক মেঘ

 

পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ছাড়াও মঙ্গল, বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস, নেপচুনে ও সিরাস বা অলক মেঘের উপস্থিতি বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন।

 

ইউরেনাসে সিরাস মেঘ

ইউরেনাসে সিরাস মেঘ

 

ইংরেজ উদ্ভাবনী রসায়নবিদ এবং আনাড়ি আবহাওয়াবিদ লুক হাওয়ার্ড ১৮০২ সালে প্রথম মেঘেরদের জন্যে স্ট্র্যাটাস, কিউমুলাস আর সিরাস এই নামগুলো প্রস্তাব করেন। ১৯০০ সালের পর আকাশপথে চলাচলের জন্যে মানুষ যখন থেকে বিমান চালনা শুরু করলো তখন নিরাপদ উড্ডয়ন এর খাতিরে আকাশ, মেঘ, আর আবহাওয়া সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জ্ঞানের প্রয়োজন পড়েছিল। বর্তমানে মেঘেদেরকে আরও অনেকগুলো ভাগে ভাগ করা হয়েছে। তবে লুক হাওয়ার্ড এর দেয়া প্রথম নামগুলো আজো রয়ে গেছে।

 

 

মন্তব্য করুন

×