মানুষের তৈরি সবচেয়ে বড় মেশিন লার্জ হ্যাড্রন কলাইডার

১৬ জুন ২০১৭ গ্রাভিটন ও অঙ্গার ৫২১

ইশকুল , , , , ,

 

মেশিন মানুষের জীবনকে সহজ, সুন্দর আর নিশ্চিন্ত করেছে। সেই সাথে জ্ঞান-বিজ্ঞানকেও এগিয়ে নিয়ে গেছে বহুদূর। মানুষের জানার গণ্ডিকে বিস্তৃত করেছে। ১৯২০ সালের দিকে আমরা জানতাম মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিই হল পুরো মহাবিশ্ব। তারপর এডুইন হাবল যখন টেলিস্কোপ দিয়ে আরও কিছু গ্যালাক্সি আর নেবুলা খুঁজে পেলেন আমাদের গ্যালাক্সির চেয়ে অনেক অনেক দূরে তখন আমরা জেনেছিলাম এই মহাবিশ্ব আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির চেয়ে ঢের বড়।

 

হুকার টেলিস্কোপ

এই হুকার টেলিস্কোপ দিয়েই এডউইন হাবল মহাবিশ্বকে দেখবার ধরণ পাল্টে দিয়েছিলেন

 

জেনেছিলাম, মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির মত আরও কোটি কোটি গ্যালাক্সি আছে মহাবিশ্বে। মানুষ নতুন করে তার সামগ্রিক পরিচয়, তার তুচ্ছতা অনুধাবন করতে পেরেছিল সেদিন। আধুনিক জ্যোতির্বিদ্যা, পদার্থবিদ্যা আমাদের জানার সীমাকে প্রতিনিয়ত প্রসারিত করে চলেছে। নতুন, পুরনো জটিল সব সমস্যার সমাধানের জন্য নানান যন্ত্রপাতির সাহায্য নিয়েছে, তৈরি করেছে বিরাট এবং জটিল সব যন্ত্রপাতি।

 

লার্জ হ্যাড্রন কলাইডার

ছবির বৃত্তাকার হলুদ দাগ বরাবর মাটির নিচে ২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি টানেল এবং আরও কিছু ছোটো বড় অংশ নিয়ে লার্জ হ্যাড্রন কলাইডার গঠিত

 

বিশালত্বের দিক দিয়ে যে মেশিনটি মানুষের তৈরি আর সব মেশিনকে ছাড়িয়ে গেছে তা হল লার্জ হ্যাড্রন কলাইডার। সংক্ষেপে LHC নামে পরিচিত।

 

LHC এর আন্ডারগ্রাউন্ড টানেল

LHC এর ২৭ কিলোমিটার আন্ডারগ্রাউন্ড টানেলের ভেতরে সাব এটমিক পার্টিকেলের সংঘর্ষ ঘটানো হয়। এই কণাগুলো আলোর বেগে গতিশীল অর্থাৎ সেকেন্ডে তিন লক্ষ কিমি। এ কণাগুলোর সংঘর্ষের ঘটানোর জন্য অনেক বেশি দীর্ঘ জায়গা প্রয়োজন

 

বর্তমান পার্টিকেল ফিজিক্সের নানা থিওরির থেকে পাওয়া ভবিষ্যদ্বাণীগুলো এবং পদার্থবিজ্ঞানের যেসব সমস্যার কোন সমাধান বের করা যায় নি এখন পর্যন্ত সেগুলো নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করার জন্য নির্মিত হয়েছে LHC। LHC দ্বারা বিগ ব্যাং বা  মহাবিস্ফোরণের কিছুক্ষণ পরের অবস্থা কৃত্রিমভাবে তৈরি করা যাবে। তবে অত্যন্ত ক্ষুদ্র পরিসরে।

 

 

LHC এর একাংশ

LHC এর একাংশ

 

ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশন, গভীর সমুদ্রের অয়েল রিগ কিংবা জার্মানির তৈরি সবচেয়ে বড় এক্সক্যাভেটর এবং স্থলের সবচেয়ে বড় যান “ব্যাগার ২৯৩” এগুলো মানব সৃষ্ট সবচেয়ে বড় বড় মেশিনগুলোর মধ্যে একদম প্রথম কাতারের। কিন্তু আকারের বিচারে লার্জ হ্যাড্রন কলাইডারের কাছে এরা নিতান্তই শিশুতুল্য। LHC মানুষের তৈরি সবচেয়ে বড় মেশিন!

 

সবচেয়ে বড় এক্সক্যাভেটর এবং স্থলযান ব্যাগার ২৯৩

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় এক্সক্যাভেটর ব্যাগার-২৯৩। এই অতিকায় যানটি ৯৬ মিটার উঁচু, মানে প্রায় ৩২ তলার সমান! সচরাচর আমরা যেসব বুলডোজার দেখি সেরকম একটিকে এই ছবিতে দেখা যাচ্ছে। দুজন ইঞ্জিনিয়ারও আছেন ছবিতে, পেয়েছেন খুঁজে?!

 

ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশন

ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশন আকারে একটি ফুটবল স্টেডিয়াম এর মতো বড়

 

শাখালিন অয়েল রিগ

Deep Sea Oil Rig – সমুদ্রের বুকে জেগে থাকা যন্ত্রদানব

 

LHC পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহৎ পার্টিকেল কলাইডার (পরমাণুর চেয়ে ছোট কণিকাগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ ঘটাবার জন্যে ব্যবহৃত আন্ডারগ্রাউন্ড টানেল)। পৃথিবীর জটিলতম এক্সপেরিমেন্টাল ফ্যাসিলিটিও এটি। ফ্রান্স এবং সুইজারল্যান্ডের সীমানা ঘেঁষে অবস্থিত LHC টি নির্মাণ করেছে CERN (European Organization for Nuclear Research)।

 

LHC: ২৭ কিমি দীর্ঘ টানেলের ভেতর কাজ করতে গেলে এরকম স্কুটারে চড়ে যেতে হয়! ইউ হ্যাভ টু বুঝতে হবে!

LHC: ২৭ কিমি দীর্ঘ টানেলের ভেতর কাজ করতে গেলে এরকম স্কুটারে চড়ে যেতে হয়! ইউ হ্যাভ টু বুঝতে হবে!

 

মাটির নিচে বৃত্তাকারে অবস্থিত এই যন্ত্রদানবটির পরিধি ২৭ কিলোমিটার! ১০০ টিরও বেশি দেশের ১০,০০০ অধিক বিজ্ঞানী, ইঞ্জিনিয়ারদের ১০ বছরের সম্মিলিত, নিরলস প্রচেষ্টায় ২০০৯ সালে LHC এর নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়। LHC তৈরিতে ব্যয় হয় ৮০,০০০ কোটি টাকা!

 

ঈশ্বর কণা নামে খ্যাত হিগস-বোসন কণার উপস্থিতি প্রমাণ করেছে লার্জ হ্যাড্রন কলাইডার

ঈশ্বর কণা নামে খ্যাত হিগস-বোসন কণার উপস্থিতি প্রমাণ করেছে লার্জ হ্যাড্রন কলাইডার

 

এরই মধ্যে ২০১২ সালে লার্জ হ্যাড্রন কলাইডার থিওরিটিক্যাল ফিজিক্সের অত্যন্ত মৌলিক একটি সমস্যা – হিগস-বোসন কণার (ঈশ্বর কণা) উপস্থিতির কথা প্রমাণ করেছে। এটাই একমাত্র মৌলিক কণা যাকে এদ্দিন পর্যন্ত বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়নি। এই পর্যবেক্ষণের থেকে পদার্থবিজ্ঞানের প্রমিত মডেল এর অজানা অনেক বিষয় সম্বন্ধে ভবিষ্যদ্বাণী করা যাবে।

 

মন্তব্য করুন

×