প্রথম প্রাণের রসায়ন

 

পৃথিবীর বর্তমান বায়ুমণ্ডলের চেয়ে একেবারে আলাদা কোন বায়ুমণ্ডলে যে প্রাণের আবির্ভাব হয়েছিল এ ধারণা জোরালোভাবে প্রথম উপস্থাপন করেন ইংরেজ প্রাণরসায়নবিদ (বায়োকেমিস্ট) জন বি এস হ্যালডেন। ১৯২০ এর দিকে তিনি ইঙ্গিত দেন যে বায়ুমণ্ডলের অক্সিজেনের জন্য দায়ী যদি হয় প্রাণ তাহলে সেই প্রাণের সূচনা হয়েছিল এমন এক সময়ে যখন বায়ুমণ্ডলে কোন অক্সিজেন ছিল না বরং কার্বনডাইঅক্সাইডে বোঝাই ছিল বায়ুমণ্ডল।

 

জন বি এস হ্যালডেন

জন বি এস হ্যালডেন

 

১৯৩৬ সালে রাশান প্রাণরসায়নবিদ আলেকজান্ডার ইভানোভিচ ওপারিন ‘দি অরিজিন অব লাইফ’ নামে একটি বই প্রকাশ করেন। এতে তিনি হিশেব কষে দেখান যে আদিম পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল মিথেন এবং অ্যামোনিয়া গ্যাসে ভরপুর ছিল। আর সেখানেই প্রাণের সূত্রপাত হয়েছিল।

 

এরকম বৈরি পরিবেশেই আদি প্রাণের সূচনা হয়েছিলো

এরকম বৈরি পরিবেশেই আদি প্রাণের সূচনা হয়েছিলো

 

দুটো ক্ষেত্রেই ছোট অণুগুলো বড়গুলোর কাঁচামাল হিসেবে কাজ করেছে। তারপরও প্রাণ যদি সৃষ্টি করতে হয় তাহলে দরকার পড়বে প্রোটিন বা নিউক্লিয়িক এসিডের মত বৃহৎ অণুর।

সোজা ভাষায় বলতে গেলে প্রাণ সৃষ্টির সাথে ছোট অণু থেকে বড় অণু গঠনের বিষয়টা জড়িত। তার সাথে দরকার পড়ে শক্তির যোগান দেয়া।

আদিম পৃথিবীতে শক্তির অন্তত চারটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস ছিল – ১। পৃথিবীর আভ্যন্তরীণ তাপ, ২। বজ্রপাতের বৈদ্যুতিক শক্তি, ৩। ভূত্বকে কিছু আইসোটোপের তেজস্ক্রিয় ভাঙ্গন, ৪। সূর্যের অতিবেগুনী রশ্মির বিকিরণ। দূরতম অতীতে এ চারটি উৎসই বিপুল পরিমাণে বিদ্যমান ছিল পৃথিবীতে।

 

দূরতম অতীতে শক্তির চারটি উৎসই বিপুল পরিমাণে বিদ্যমান ছিল পৃথিবীতে

দূরতম অতীতে শক্তির চারটি উৎসই বিপুল পরিমাণে বিদ্যমান ছিল পৃথিবীতে

 

পৃথিবীর আদিম অবস্থা ল্যাবরেটরীতে কৃত্রিমভাবে তৈরির প্রথম চেষ্টা চালান মেলভিন ক্যালভিন। এ পরীক্ষার জন্য তিনি কার্বনডাইঅক্সাইড এবং জলীয়বাষ্পকে কাঁচামালরুপে ব্যবহার করেন। আর শক্তির উৎস হিসেবে তেজস্ক্রিয় আইসোটোপের দ্রুতগামী কণিকা নির্গমনকে কাজে লাগিয়েছিলেন ।

 

মেলভিন ক্যালভিন

মেলভিন ক্যালভিন: পৃথিবীর আদিম অবস্থা ল্যাবরেটরীতে কৃত্রিমভাবে তৈরির প্রথম চেষ্টা চালান

 

ক্যালভিন তাঁর কার্বনডাইঅক্সাইড এবং জলীয়বাষ্পের মিশ্রণকে তেজস্ক্রিয় আইসোটোপের সংস্পর্শে নিয়ে আসেন। নতুন কোন যৌগ তৈরি হল কিনা তা দেখার জন্য কিছুক্ষন পর তিনি ঐ মিশ্রণ পরীক্ষা করে দেখলেন। অত্যন্ত সরল কিছু জৈব অণুর উপস্থিতি তিনি লক্ষ্য করেন সেখানে। মৌলিক অণুগুলোর তুলনায় সদ্যসৃষ্ট অণুগুলো ছিল আকারে বড় আর জটিল। ফরমালডিহাইড (HCHO) এবং ফরমিক (HCOOH) এসিড পেয়েছিলেন ক্যালভিন তাঁর গ্যাসীয় মিশ্রণে।

শুরুটা আশাপ্রদ ছিল। বুঝা গেল, আদিম পৃথিবীতে বিদ্যমান শক্তিগুলোর কোন একটিকে কাজে লাগিয়ে সরল অণু থেকে জটিল অণু গঠিত হওয়া সম্ভব…

১৯৫৩ সালে বিজ্ঞানী স্ট্যানলি লয়েড মিলার অ্যামোনিয়া, মিথেন আর হাইড্রোজেন গ্যাসের একটি মিশ্রণ বড় একটি কাঁচপাত্রে রাখেন। আরেকটি কাঁচপাত্রে পানি রেখে সেটা ফুটাতে থাকেন। এর ফলে উৎপন্ন জলীয়বাষ্প দুটো কাঁচপাত্রকে সংযোগকারী টিউবের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গ্যাসের মিশ্রনে প্রবেশ করে।

 

স্ট্যানলি মিলার

 

জলীয়বাষ্পের ধাক্কায় গ্যাসের মিশ্রণ আবার আরেকটি টিউবের মধ্যে দিয়ে ফুটন্ত জলের সংস্পর্শে আসে। দ্বিতীয় টিউবটির উপর দিয়ে শীতল পানি চালনা করা হয় যেন বাস্প ঘনীভূত হয়ে তরলে পরিণত হয় আর ফোঁটায় ফোঁটায় জমা হয় ফুটন্ত পানির জারে। বুদবুদ আকারে গ্যাসের মিশ্রণ ফুটন্ত পানির পাত্র হয়ে আবার প্রথম গ্যাসজারে ফিরে আসে। এভাবে প্রতিবার নতুন সৃষ্ট জলীয়বাষ্পের তাড়া খেয়ে একই পথে বারবার ঘুরপাক খেতে থাকে।

 

মিলার-ইউরে পরীক্ষা যেভাবে চালনা করা হয়েছিলো

মিলার-ইউরে পরীক্ষা যেভাবে চালনা করা হয়েছিলো

 

স্বাভাবিকভাবেই, পরীক্ষায় ব্যবহৃত সকল যন্ত্রপাতি যে সম্পূর্ণ জীবানুমুক্ত ছিল এ ব্যাপারটা মিলার আগে নিশ্চিত করেন। আর পুরো সিস্টেমে একটিও জীবিত কোষ ছিল না যার থেকে জটিল যৌগের সৃষ্টি হওয়া সম্ভব। যদি কোন জটিলতর যৌগ এই এক্সপেরিমেন্টে তৈরি হয় তাহলে বুঝতে হবে যে যৌগটি পুরোদস্তুর প্রাণের উপস্থিতি ছাড়াই তৈরি হয়েছে।

শক্তির উৎস হিসেবে অতিবেগুনী রশ্মির আলো ব্যবহার করা যৌক্তিক। তবে ঝামেলা হল এই অতিবেগুনী আলো আবার খুব সহজেই কাঁচের পাত্র দ্বারা শোষিত হয়। ফলে কাঁচ ভেদ করে পর্যাপ্ত পরিমাণ শক্তি গ্যাস মিশ্রণে পাঠানো কঠিন হয়ে পড়ে। মিলার তাই বজ্রপাতে পাওয়া শক্তির অনুকরণে একটি বৈদ্যুতিক স্পার্ক ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেন। সিস্টেমের একাংশে গ্যাসের পাত্রে তিনি একটি অবিরাম বৈদ্যুতিক স্পার্কের ব্যবস্থা করেন।

অনেক জিনিস ঘটতে শুরু করলো তারপর। শুরুতে ফুটন্ত পানি আর গ্যাসের মিশ্রণ ছিল বর্ণহীন। একদিন পর সে মিশ্রণ গোলাপি রঙ ধারণ করলো। দিন যত গড়াল রঙ ততো গাঢ় হল। শেষে একেবারে গাঢ় লালবর্ণের একটি তরলে পরিণত হল।

 

...শেষে একেবারে গাঢ় লালবর্ণের একটি তরলে পরিণত হল

…শেষে একেবারে গাঢ় লালবর্ণের একটি তরলে পরিণত হল

 

এক হপ্তা পর মিলার তার মিশ্রণকে বিশ্লেষণ করে দেখার সিদ্ধান্ত নেন। ক্যালভিনের মত তিনিও জৈব অণু খুঁজে পেয়েছিলেন তাঁর মিশ্রণে। এসব সরল জৈব অণুর একটি হল ফরমিক এসিড যা ক্যালভিনও তার পরীক্ষায় সনাক্ত করেছিলেন। ফরমিক এসিডের সাথে সম্পর্কিত আরও কিছু জটিল জৈব অণু সনাক্ত করেছিলেন মিলার। যার মধ্যে অ্যাসিটিক এসিড (CH3COOH), গ্লাইকোলিক এসিড (HOCH2-COOH), ল্যাক্টিক এসিড (CH3CHOH-COOH) অন্যতম। প্রাণের সাথে এ সবকটি যৌগই ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।

জটিল যৌগ গঠিত হবার সময় যেন নাইট্রোজেন পরমাণু বিদ্যমান থাকে সে জন্যে প্রথম মিশ্রণে বাকি গ্যাসগুলোর সাথে অ্যামোনিয়া গ্যাস যোগ করা হয়েছিল। আর মিলারও তাঁর চূড়ান্ত মিশ্রণে নাইট্রোজেন-ঘটিত জটিল যৌগের উপস্থিতি খুঁজে পেয়েছিলেন। হাইড্রোজেন সায়ানাইড আর ইউরিয়া ছিল সে মিশ্রণে।

মিলার তাঁর পরীক্ষায় উৎপন্ন যৌগগুলোর মধ্যে দুটো ভিন্ন অ্যামিনো এসিড খুঁজে পেয়েছিলেন। বাকি সবকিছুর মধ্যে এটি ছিল সবচাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। (বড় বড় প্রোটিন অণু তৈরির সময় তুলনামূলকভাবে আকারে ক্ষুদ্র অ্যামিনো এসিডগুলো বিল্ডিংব্লক হিশেবে ব্যবহৃত হয়) যত রকমের প্রোটিন অণু আছে তার সবগুলোই ১৯ টি ভিন্ন অ্যামিনো এসিডের বিভিন্ন সংখ্যায় নানান কম্বিনেশনে যুক্ত হবার কারণে তৈরি হয়। মিলার সনাক্ত করেছিলেন সরলতম দুটি অ্যামিনো এসিড – গ্লাইসিন আর অ্যালানিন।

 

অ্যামিনো এসিড থেকে প্রোটিনে রুপান্তর

আলাদা অ্যামিনো এসিডগুলো পরস্পর যুক্ত হয়ে পেপটাইড চেইন তৈরি করে, এরকম একাধিক পেপটাইড চেইন মিলে তৈরি হয় প্রোটিন

 

কিছু বিশেষ কারণে মিলারের পরীক্ষাটি তাৎপর্যপূর্ণ। প্রথমত, যৌগগুলো তৈরি হয়েছিল কম সময়েই আর আশ্চর্যজনক বেশি পরিমাণে। যতটুকু মিথেন গ্যাস নিয়ে তিনি এই এক্সপেরিমেন্টটি শুরু করেছিলেন তার ১/৬ ভাগ জটিলতর জৈব যৌগ গঠনে ব্যবহৃত হয়েছিল। যদিও পরীক্ষাটি চালুর পর কেবল এক সপ্তাহ অতিবাহিত হয়েছিল।

আদিম পৃথিবীতে ব্যাপারটা কিরকম ছিল – যখন বিস্তৃত উষ্ণ অ্যামোনিয়াসমৃদ্ধ সমুদ্র আলোড়িত হত মিথেন হাওয়ায়? কোটি কোটি বছর ধরে সূর্যের অতিবেগুনী বিকিরণে পুড়ে গিয়ে পৃথিবীর কি হাল হয়েছিল? অগুনতি, টনের পর টন জটিল জৈব যৌগ তৈরি হয়েছিল নিশ্চয়ই। আর সমুদ্র এসব যৌগের এক প্রকার ‘গরম স্যুপ’ এ পরিণত হয়েছিল।

 

প্রিমর্ডিয়াল স্যুপ থেকেই প্রাণের বিকাশ

উত্তপ্ত প্রিমর্ডিয়াল স্যুপ থেকে আদি প্রাণের উদ্ভব হয়েছিল

 

তার উপর, জীবিত কোষ বা টিস্যুতে বিদ্যমান জৈব অণুগুলোই মিলারের পরীক্ষায় তৈরি হয়েছিল। ছোট অণু থেকে বড় অণু গঠিত হবার যে পথ সে পথ যেন সরাসরি প্রাণের দিকেই ধাবমান। পরবর্তীতে একের পর এক বিশদ সব পরীক্ষা নিরীক্ষাতেও এই প্রাণের-দিকে-ধাবমান বিষয়টা লক্ষ্য করা গেছে। কোনবারই উল্লেখযোগ্য কোন অজানা অণু গঠিত হয়নি যা প্রাণ ছাড়া অন্য দিক নির্দেশ করে।

 

আদি মহাসাগর

…ছোট অণু থেকে বড় অণু গঠিত হবার যে পথ সে পথ যেন সরাসরি প্রাণের দিকেই ধাবমান। ১১ টি ধাপে সরলতম জৈব অণু থেকে জটিল বহুকোষী জীবের বিকাশ এখানে দেখানো হয়ছে

 

ওয়াশিংটনের কার্নেগি ইন্সটিটিউটের ফিলিপ হজ অ্যাবেলসন মিলারের গবেষণা কাজগুলোর পুনরাবৃত্তি ঘটান। শুরুর কাঁচামাল হিশেবে বিভিন্ন গ্যাস বিভিন্ন অনুপাতে নিয়ে তিনি মিলারের অনুকরণে বেশ কিছু এক্সপেরিমেন্ট চালান। দেখা গেল যে, কার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন আর নাইট্রোজেন পরমাণু সমৃদ্ধ অণুগুলো নিয়ে পরীক্ষা চালালে সাধারণত প্রোটিনে যেসব অ্যামিনো এসিড থাকে সেগুলো তৈরি হয়।

 

অ্যামিনো এসিডের গঠন

কার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন আর নাইট্রোজেন পরমাণু সমৃদ্ধ অণুগুলো নিয়ে পরীক্ষা চালালে সাধারণত প্রোটিনে যেসব অ্যামিনো এসিড থাকে সেগুলো তৈরি হয়

 

বৈদ্যুতিক ডিসচার্জ ছাড়াও এই এক্সপেরিমেন্টে শক্তির যোগান দিতে অন্য উৎসের ব্যবহার শুরু হল। ১৯৫৯ সালে দুজন জার্মান বিজ্ঞানী ভ. গ্রথ এবং এইচ. ফন ভিসেনহফ এমন একটি পরীক্ষার পরিকল্পনা করেন যেখানে অবশেষে অতিবেগুনী আলোকে শক্তির উৎস হিশেবে ব্যবহার করা যাবে। উল্লেখ্য, তাঁরাও অ্যামিনো এসিড পেলেন পরীক্ষায়।

কিন্তু আরও কিছুদূর এগিয়ে যাওয়া প্রয়োজন ছিল। অত্যন্ত সরল বিক্রিয়াজাত পদার্থ ছাড়িয়ে জটিল আর বড় যৌগ তৈরির দরকার পড়লো। যেটা করবার একটা উপায় হল বেশি বেশি কাঁচামাল নিয়ে পরীক্ষা শুরু করে বেশি সময় ধরে সেগুলোকে শক্তির সংস্পর্শে রাখা। তাহলে বেশি পরিমাণে জটিল থেকে জটিলতর পদার্থ তৈরি হবে। কিন্তু এভাবে সৃষ্ট উচ্চতর জটিল যৌগের মিশ্রণ ক্রমশ জটিল হতে থাকবে। তখন এসব পদার্থের বিশ্লেষণ করার ব্যাপারটা আরও গোলমেলে হয়ে পড়বে।

তার বদলে পরবর্তী ধাপটাই আগে করে ফেলার কাজে নামলেন কয়েকজন রসায়নবিদ। আগের পরীক্ষাগুলো থেকে উৎপন্ন পদার্থগুলোকে এই ধাপে পরীক্ষার জন্যে কাঁচামালরুপে ব্যবহার করা হবে। যেমন, হাইড্রোজেন সায়ানাইড  ছিল মিলারের পরীক্ষায় উৎপন্ন পদার্থগুলোর একটি। ১৯৬১ সালে হিউস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্পেনিশ-আমেরিকান বায়োকেমিস্ট জে. অরো তাঁর পরীক্ষার জন্য প্রাথমিক মিশ্রণে হাইড্রোজেন সায়ানাইড গ্যাস ব্যবহার করেন। পরীক্ষা শেষে অরো অ্যামিনো এসিড সমৃদ্ধ একটি মিশ্রণ সংগ্রহ করেন। প্রোটিনে আলাদা আলাদা অ্যামিনো এসিড অণুগুলো যেভাবে একটি আরেকটির সাথে আটকানো থাকে তেমনি পৃথক অ্যামিনো এসিডের তৈরি ছোট শেকলের কিছু যৌগও উৎপন্ন করতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি।

বিজ্ঞানী অরো পিউরিন ও তৈরি করেছিলেন তাঁর পরীক্ষায়। পিউরিন হল কার্বন আর নাইট্রোজেন পরমাণু দ্বারা তৈরি একটি দ্বিচাক্রিক জৈব যৌগ। অনেকগুলো নিউক্লিয়িক এসিড অণুতে পিউরিন পাওয়া যায়। অ্যাডেনিন নামের একটি বিশেষ পিউরিন উক্ত পরীক্ষা থেকে সংগ্রহ করা হয়। অ্যাডেনিন যে শুধু নিউক্লিয়িক এসিডেই পাওয়া যায় তা নয় বরং প্রাণের সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যৌগেও অ্যাডেনিন থাকে।

 

 

১৯৬২ সালে বিজ্ঞানী অরো তাঁর এক্সপেরিমেন্টে একটি কাঁচামাল হিশেবে (বাকিগুলোর সাথে) ফরমালডিহাইড ব্যবহার করেন। এবারে অরো পাঁচ-কার্বন-বিশিষ্ট রাইবোজ এবং ডিঅক্সিরাইবোজ শ্যুগার উৎপাদন করতে পেরেছিলেন। রাইবোজ আর ডিঅক্সিরাইবোজ শ্যুগার নিউক্লিয়িক এসিডের অপরিহার্য উপাদান।

 

রাইবোজ এবং ডিঅক্সিরাইবোজ শ্যুগার

রাইবোজ এবং ডিঅক্সিরাইবোজ শ্যুগার যথাক্রমে RNA আর DNA এর অপরিহার্য উপাদান

 

১৯৬৩ সাল। শ্রীলঙ্কান বায়োকেমিস্ট সিরিল পুন্নামপেরুমা তখন ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যামিস রিসার্চ সেন্টারে কাজ করছেন, রুথ ম্যারিনার আর কার্ল স্যাগান সেখানে তাঁর সহকর্মী। অ্যাডেনিন এবং রাইবোজকে কাঁচামাল বানিয়ে এদেরকে অতিবেগুনী আলোর সংস্পর্শে আনেন সিরিল। নিউক্লিয়িক এসিড অণুতে এরা যেভাবে সংযুক্ত থাকে ঠিক ঐ ধাঁচেই অ্যাডেনিন আর রাইবোজ পরস্পর যুক্ত হয়ে ‘অ্যাডিনোসিন’ তৈরি করল।

 

শ্রীলঙ্কান বায়োকেমিস্ট সিরিল পুন্নামপেরুমা

শ্রীলঙ্কান বায়োকেমিস্ট সিরিল পুন্নামপেরুমা

 

প্রাথমিক মিশ্রণে ফসফেট যোগ করা হলে দেখা গেল যে এই ফসফেট গ্রুপও অ্যাডিনোসিন এর সাথে যুক্ত হয়ে ‘অ্যাডেনাইলিক এসিড’ গঠন করে। যে দুটি নিউক্লিওটাইড নিউক্লিয়িক এসিডের বিল্ডিং ব্লকের কাজ করে অ্যাডেনাইলিক এসিড তাদের একটি। সত্যি, ১৯৬৫ সালে পুন্নামপেরুমা জোরেশোরে জানিয়ে দিলেন যে তিনি একটি ‘ডাবল নিউক্লিওটাইড’ তৈরিতে সফল হয়েছেন। নিউক্লিয়িক এসিডের অণুতে দুটো নিউক্লিওটাইড যেভাবে যুক্ত থাকে সেই একইভাবে যুক্ত হয়ে এরা ডাবল নিউক্লিওটাইড কাঠামো সৃষ্টি করে।

কম কথায়, বায়ুমণ্ডল ১ এর কাঁচামাল পরিমিত যে কোন শক্তি উৎসের (বিশেষ করে অতিবেগুনী আলোর) সংস্পর্শে থাকলে দ্রুত জটিল থেকে জটিলতর অণুর জন্ম দেয়। যেগুলো পরিণতিতে প্রোটিন আর নিউক্লিয়িক এসিডের দিকেই সরাসরি এগোতে থাকে।
প্রাণের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতিতে গবেষণাগারে বিজ্ঞানীরা এখনো পর্যন্ত প্রাকৃতিক প্রোটিন এবং নিউক্লিয়িক এসিড সৃষ্টি করতে পারেননি ঠিকই। কিন্তু পুরো ব্যাপারটা যে কোন দিকে যাচ্ছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এভাবে পরিণতিতে প্রাণের বৈশিষ্ট্য দেখায় পর্যাপ্ত জটিল এমন সব অণুগুলো আদিম পৃথিবীতেই সৃষ্টি হয়েছিল।

এভাবেই, শেষে নিউক্লিয়িক এসিড গঠিত হয়েছিল। নিউক্লিয়িক এসিডে এমন জটিল সব অণু আছে যারা উপযুক্ত কাঁচামাল থেকে হুবহু তাদের নিজেদের মত দেখতে অণুর প্রতিলিপি বা কপি উৎপন্ন করতে সক্ষম। এরকম নিউক্লিয়িক এসিড অণুগুলো নিজেরাই নিজেদের সংখ্যাবৃদ্ধি আর রক্ষণাবেক্ষণ করে থাকে। কোন কিছুকে জীবিত বলতে হলে একদম ন্যূনতম এই বৈশিষ্ট্যটি থাকা আবশ্যক। আমরা যাকে প্রাণ বলি, এই অণুগুলো তারই প্রথম এবং সরলতম প্রকাশ।

 

ডিএনএ অনুলিপন

প্রাণের অপরিহার্য অণু DNA নিজেই নিজের অনুলিপি তৈরি করে

 

এ সবকিছু ঘটেছিল কখন? বিজ্ঞানী ক্যালভিন পাথরের মধ্যে আটকে পড়া প্রায় তিনশো কোটি বছর পুরনো জটিল হাইড্রোকার্বন অণু (কার্বন আর হাইড্রোজেনের তৈরি জৈব যৌগ) পৃথক করেছিলেন। এগুলো সম্ভবত খুব সরল কোন জীবের অবশিষ্টাংশ যা এই পাথরটি সৃষ্টির সময় জীবন্ত ছিল।

 

পাললিক শিলা

পাললিক শিলার স্তরে স্তরে চাপা পড়ে আছে কোটি বছর আগেকার প্রাণীদের নিদর্শন

 

বলা হয় পৃথিবীর ভূত্বকের বয়স সাড়ে তিনশো কোটি বছরের বেশি নয়। তার মানে দাঁড়ায়, মোটামুটি ৫০ কোটি বছরের ‘রাসায়নিক বিবর্তন’ এর পর প্রাণের সত্যিকার আবির্ভাব হয়েছিল। যখন আমরা দেখি যে, মাত্র কয়েক দিন কিংবা কয়েক সপ্তাহ ধরে গবেষণাগারে ছোট-মাপে রাসায়নিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানোর পর এতো কিছু তৈরি হচ্ছে তখন পুরো বিষয়টাকে আর খুব বিস্ময়কর মনে হয় না।

‘উদ্দেশ্যহীন’ রাসায়নিক প্রক্রিয়াগুলো  আদতে অতোটা উদ্দেশ্যহীন নয়। নির্দিষ্ট কিছু কাঁচামাল আর তাতে শক্তির সরবরাহ নিশ্চিত করা হলে জানা ভৌত ও রাসায়নিক নিয়ম অনুসারে যেসব পরিবর্তন সবচেয়ে সম্ভাব্য ঠিক সেগুলোই ঘটে থাকে এখানে। এসব পরিবর্তন যে অবধারিতভাবে প্রাণ সৃষ্টির দিকেই ধাবমান সে বিষয়টা জলের মত পরিষ্কার। আর প্রাণ তাই যেসব পরিবর্তন ঘটার সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা রয়েছে সেগুলোরই ফলাফল। সব ঠিকঠাক থাকলে এসব পরিবর্তন এড়িয়ে যাওয়াই বরং অসম্ভব। এ দৃষ্টিকোণ থেকে প্রাণের উদ্ভব মোটেও কোন অলৌকিক ব্যাপার নয়।

 

ট্রি অব লাইফ

 

 

[লেখাটি বিখ্যাত সায়েন্স ফিকশন লেখক আইজাক আসিমভের Photosynthesis (1968) বইটির নির্বাচিত একাংশের অনুবাদ। এই উদ্ধৃত অংশটুকু একটি শিরোনামের নিচে নিয়ে আসার ব্যাপারে অনুবাদক নিজের সৃজনী স্বাধীনতাকে ব্যবহার করেছেন। – মূল ‘Photosynthesis’, Opus – a selection form the first 200 books by Isaac Asimov, Granada Publishing, 1982]

মন্তব্য করুন

×