দালোল: পৃথিবীর নরক

০১ এপ্রিল ২০১৭ সঞ্জয় কুমার বেলোয়ার ৬৪৩

ইশকুল , , ,

 

দালোল বিষুবরেখার নিকটবর্তী হর্ন অফ আফ্রিকা, উত্তর-পূর্ব আফ্রিকার দেশ ইথিওপিয়ায় অবস্থিত। গড় তাপমাত্রার বিচারে এটি পৃথিবীর সবচেয়ে উষ্ণতম স্থান। উঁচু পর্বত আর ঊষর মরুভূমির এই রুক্ষ দেশটির উত্তর-পূর্বে দ্বিতীয় প্রশাসনিক অঞ্চলের দালোল আগ্নেয়গিরি থেকে জন্ম নেয়া দালোল ডিপ্রেশনটি (দেবে যাওয়া অঞ্চল) পৃথিবীর সবচেয়ে নিচু জায়গাগুলোর একটি। তবে দালোল কিন্তু আরও বড় একটি অবতল বা দেবে যাওয়া অঞ্চলের অংশবিশেষ যা দানাকিল ডিপ্রেশন নামে ভূতাত্ত্বিকদের নিকট পরিচিত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এই অবতল অঞ্চলটি ১২৫ মিটার এর মতো নিচু যা পৃথিবীর নিন্মতম অঞ্চলগুলোর একটি।

 

দানাকিল ডিপ্রেশনের একটি অংশ, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এই অবতল অঞ্চলটি ১২৫ মিটার এর মতো নিচু

 

দালোলে যারাই গেছেন তাদের সবারই অন্তত একবার হলেও মনে হয়েছে, “হলি কাউ, আমি কি পৃথিবীতে আছি”?! এমন উষর মরুভূমির মাঝে  কেমন সবুজাভ-হলদে তরলের নানান সাইজের চৌবাচ্চা, ছোট বড় সাদা স্তম্ভ। আর চারপাশে কেমন বিচ্ছিরি, ঝাঁঝালো গন্ধ।

 

দালোলের একটি লবণ স্তম্ভ

 

এই সবুজাভ তরলটি হচ্ছে তীব্র এসিড এবং পৃথিবীপৃষ্ঠের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসা বিভিন্ন বিষাক্ত গ্যাসের কারণে এখানের বাতাস অনেক ভারি, ভাবতেই অবাক লাগে যে এরকম বৈরী একটি পরিবেশ আমাদের পৃথিবীতে থাকতে পারে।

 

গড় তাপমাত্রার বিচারে দালোল পৃথিবীর উষ্ণতম স্থানগুলোর একটি

 

 

লবণের দেয়াল দিয়ে তৈরি এই চৌবাচ্চাগুলোয় আছে তীব্র অ্যাসিড, যার pH ১ এর চেয়ে কম

 

দালোল এলাকাটি ভূতাপীয় এলাকা হিসেবে দারুণ সক্রিয়। দালোল হচ্ছে পৃথিবীর অন্যতম তাপীয় এলাকা যার বার্ষিক তাপমাত্রা গড়ে 35°C এবং গ্রীষ্ম মৌসুমে তা 45°C ছাড়িয়ে যায়। এটা হলো প্রকৃতির এমন এক সৃষ্টি যা নরকতুল্য। উত্তপ্ত জলে যে লবন গুলো দ্রবীভূত ছিলো তা হতে উত্তপ্ত বাতাসের ধারা অবিরাম বহমান। উত্তপ্ত পরিবেশে যখন লোনা জল বাষ্পীভূত হয় তাতে বিদ্যমান সালফার, আয়রন গঠিত যৌগের কারণে সাদা, হলুদ, সবুজ বা ধূসর বর্ণের সৃষ্টি হচ্ছে।

 

অস্থায়ী উষ্ণ প্রস্রবণের কারণে সৃষ্ট খনিজ লবণের স্তম্ভ

 

জায়গায় জায়গায় অস্থায়ী গিজারের চারপাশে লবণ জমে সাদা স্তম্ভের সৃষ্টি করেছে। এর পৃষ্ঠ এলাকা তীব্র এসিড পূর্ণ  যার pH ১ এর চেয়েও কম। আর উষ্ণ প্রস্রবণ থেকে নিঃসৃত সালফার সমৃদ্ধ গ্যাসের কারণে আশেপাশের এলাকা হতে পচা ডিমের গন্ধ বেরোয়।

 

পচা ডিমের মৌতাত ছড়িয়ে পড়ছে আশেপাশে!

 

দালোল ডিপ্রেশন বা অবতল অঞ্চলটি সৃষ্টি হয়েছিল ১৯২৬ সালে এক এক তীব্র ভূগর্ভস্থ উদগীরণের পর সমস্ত অঞ্চলটুকু দেবে যাওয়ায়। ইথিওপিয়ার এ অংশটা ভূতাত্ত্বিক দিক থেকে দারুণ সক্রিয়।

 

দানাকিল ডিপ্রেশনে লাভা উদগীরণ

 

এরতা এলে, দানাকিল অবতল অঞ্চলের একটি আগ্নেয়গিরি

 

“আফার ট্রিপল জংশন” তিনটি টেকটোনিক প্লেট (আফ্রিকান, সোমালিয়ান, এরাবিয়ান প্লেট) একে অপর থেকে আস্তে আস্তে দূরে সরে যাওয়ায় এই অঞ্চলটা ধীরে ধীরে দেবে যাচ্ছে।

 

স্যাটেলাইট থেকে দেখা দানাকিল ডিপ্রেশন

 

কয়েক মিলিয়ন বছর পরে এ অবতল অংশটুকু সাগরে ডুবে যাবে। ইথিওপিয়া আর ইরিত্রিয়ার মাঝে একটা নতুন সাগর জায়গা করে নেবে। বদলে যাবে মানচিত্র।

 

মিলিয়ন বছর পর আস্তে আস্তে আফার ডিপ্রেশন অঞ্চল দিয়েই সমুদ্র ঢুকে পড়বে, মানচিত্র যাবে পাল্টে

 

অবশ্য এমন করে মানচিত্র বদলে যাবার ঘটনা এটা প্রথম নয়। দেড় কোটি বছর আগে প্যাঙ্গিয়া (পৃথিবীর সমগ্র স্থলভাগ যখন একসাথে ছিল তখনকার নাম ) আস্তে আস্তে ভেঙ্গে যেতে থাকে মহাদেশীয় সঞ্চারণের (continental drift) কারণে আর এর ফলেই আমরা পৃথিবীর এমন একটি মানচিত্র পেয়েছি যেখানে সবকটা মহাদেশ একে অন্যের চেয়ে বিস্তর দূরত্বে অবস্থান করছে।

 

 

আবার উলটো প্রক্রিয়াটাও কিন্তু এখন পৃথিবীর অন্যান্য জায়গায় ঘটমান। যেখানে একাধিক টেকটোনিক প্লেট একে অপরের উপর অবিরাম ধাক্কা দিয়ে চলেছে। সে সব স্থানে রয়েছে উঁচু পর্বতমালার সারি।

 

 

আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো, ভারতের মিজোরাম, মনিপুর, আসামের পর্বতগুলো, সর্বোপরি হিমালয় পর্বতমালাও সৃষ্টি হয়েছে এই প্রক্রিয়ায়। ইউরেশিয়ান, ইন্ডিয়ান আর বার্মিজ সাব-প্লেট -এই তিনটি টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষের কারণে এটা সম্ভব হয়েছে।

 

সবচেয়ে ভুমিকম্প প্রবণ এলাকাগুলোকে হলুদ রঙে চিহ্নিত করা হয়েছে, লাল বৃত্তের ভেতরের অংশটুকু ভারতীয় উপমহাদেশের অন্তর্গত

 

এ তিনটি প্লেটের ধাক্কা অবিরাম চলে আসছে আর তাই এই অঞ্চলটুকু অনেক বেশি ভুমিকম্প প্রবন।

 

 

মন্তব্য করুন

×