জাহাজ ভাঙ্গা শিল্প – সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পেশা এবং জীবন ও পরিবেশের হুমকি

বুড়িয়ে যাওয়া, বিকল, অকেজো আর মেরামতের অযোগ্য ছোট বড় কার্গো শিপ আর তেলবাহী ট্যাংকারের শেষ ঠিকানা হয় শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড এ। এখানে জাহাজগুলোকে ভেঙ্গে-কেটে তার থেকে পুনরায় ব্যবহার্য লোহা, স্টিল এসব জড়ো করা হয়। বাংলাদেশের চট্টগ্রামে যে শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড আছে সেটাতে গোটা পৃথিবীর সব বিকল, পুরনো জাহাজের ৪ ভাগের ১ ভাগকে ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেয়া হয়। চট্টগ্রাম শহরের উত্তরে সাগরের তীর ঘেঁষে অবস্থিত ১১ মাইল দীর্ঘ এই শিপব্রেকিং ইয়ার্ডটি পৃথিবীর বৃহত্তম জাহাজভাঙ্গার কারখানা।

 

বঙ্গোপসাগরের তীরে চট্টগ্রামের ভাটিয়ারী শিপব্রেকিং ইয়ার্ড, স্যাটেলাইট থেকে তোলা

বঙ্গোপসাগরের তীরে চট্টগ্রামের ভাটিয়ারী শিপব্রেকিং ইয়ার্ড, স্যাটেলাইট থেকে তোলা

 

বাংলাদেশের শিল্পকারখানাগুলোতে যত লোহার দরকার পড়ে তার ৮০-৯০ শতাংশ আসে ফৌজদারহাটের জাহাজ ভাঙ্গার কারখানাগুলো থেকে। প্রায় ২ লক্ষ শ্রমিক দিনে ১২-১৬ ঘণ্টা করে সারাবছর কাজ করে।

 

শিপব্রেকিং ইয়ার্ডঃ জাহাজের গোরস্থান

শিপব্রেকিং ইয়ার্ডঃ জাহাজের গোরস্থান

 

এ শিল্পের শ্রমিকদের যেমন মজুরি অনেক কম তেমনি কাজের ঝুঁকিও অনেক বেশি। শ্রমিকদের একাংশ জাহাজ ভাঙ্গা-কাটার কাজ করে, একদল জাহাজের সেই অংশ টেনে বয়ে নিয়ে আসে তীরে। সেখানে জাহাজের ঐ অংশটাকে আবার ছোট ছোট অংশে কেটে কারখানায় পাঠানো হয়।

 

গ্যাস কাটিংঃ অক্সি-এসিটিলিন শিখার সাহায্যে লোহার পুরু পাতগুলোকে কাটা হয়

গ্যাস কাটিংঃ অক্সি-এসিটিলিন শিখার সাহায্যে লোহার পুরু পাতগুলোকে কাটা হয়

 

চলছে ভাঙ্গাভাঙ্গি আর কাটাকাটি...

চলছে ভাঙ্গাভাঙ্গি আর কাটাকাটি…

 

ভাঁটার সময় পানি নেমে গেলে জাহাজ থেকে কেটে নেয়া বড় বড় অংশগুলো এভাবে টেনে তীরে নিয়ে যাওয়া হয়

ভাঁটার সময় পানি নেমে গেলে জাহাজ থেকে কেটে নেয়া বড় বড় অংশগুলো এভাবে টেনে তীরে নিয়ে যাওয়া হয়

 

ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় কোনরকম সুরক্ষামূলক ব্যাবস্থা (ভারি বুট, হার্ড হ্যাট, গ্যাস মাস্ক ইত্যাদি) ছাড়া কাজ করার কারণে প্রতি মাসে গড়ে ২ জন শ্রমিক মারা যায় দুর্ঘটনায়। জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতির কারণে প্রায়ই বিস্ফোরণ ঘটে।

 

শিপব্রেক ইয়ার্ডে গ্যাস বিস্ফোরণ

পাকিস্তানের গাদানি শিপব্রেক ইয়ার্ডে এক ভায়াবহ বিস্ফোরণে ২৬ জন শ্রমিক প্রাণ হারায়

 

এরকম দুর্ঘটনায় অনেক শ্রমিক হতাহত হয়ে থাকে। ভারী লোহার পাত বা টুকরার নিচে চাপা পড়েও পঙ্গু হয়েছেন, প্রাণ হারিয়েছেন অনেক শ্রমিক।

 

কয়েকদিন ধরে কাটাকাটির পর একটি জাহাজের ডেকের একাংশ আচমকা আছড়ে পড়ে নিচে আর চারদিকে স্টিল-লোহার টুকরা ছড়িয়ে পড়ে

কয়েকদিন ধরে কাটাকাটির পর একটি জাহাজের ডেকের একাংশ আচমকা আছড়ে পড়ে নিচে আর চারদিকে স্টিল-লোহার টুকরা ছড়িয়ে পড়ে

 

এছাড়াও এ কাজের সাথে জড়িত শ্রমিকদের asbestos, PCB এর মতো ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শে আসতে হয়ে প্রায়ই। এসব বিষাক্ত রাসায়নিক শুধু যে মানবদেহে দীর্ঘস্থায়ী অসুখের জন্ম দেয় তা নয়, পানিকেও মারাত্মকভাবে দুষিত করে। সব মিলিয়ে ভাটিয়ারীর সবগুলো শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে ৭৯,০০০ টন এসবেস্টস, ২,৪০,০০০ টন PCB এবং ২,১০,০০০ টন ওজোন স্তর ক্ষয়কারী ক্লোরিনেটেড পলিইউরাথেন ফোম পড়ে আছে স্তুপাকারে।

 

এসবেস্টস আর ফোমে দূষিত হচ্ছে সাগরের পানি

এসবেস্টস আর পলিইউরাথেন ফোমে দূষিত হচ্ছে উপকূলের পানি

 

যত্রতত্র পড়ে আছে পলিইউরাথেন ফোম

যত্রতত্র পড়ে আছে পলিইউরাথেন ফোম

 

এরকম ঝুঁকিপূর্ণ আর পরিবেশের ক্ষতিকারক শিল্প উন্নতবিশ্বের অনেক দেশেই নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে। মানবাধিকার এবং পরিবেশবাদী কর্মীদের অনেক আর্জি-বিরোধিতা-প্রতিবাদের পরও সংশ্লিষ্ট জাহাজ ভাঙ্গা কারখানাগুলো দিব্যি টিকে আছে। এখনো তাদের এই ঝুঁকিপূর্ণ উৎপাদন প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে মানব জীবনহানি আর পরিবেশ দূষণের কথা তোয়াক্কা না করে। এমনকি শিপব্রেকিং ইয়ার্ডের বেশিরভাগ জায়গায় এক রকমের “প্রবেশ নিষেধ” নিয়ম জারি আছে। দেশি – বিদেশি পরিদর্শকদের কাছ থেকে ইয়ার্ডের অস্বাস্থ্যকর, ঝুঁকিপূর্ণ কাজের জায়গা, শ্রমিকদের মানবেতর জীবনযাপন, পরিবেশ দূষণ এ সবকিছু গোপন রাখতেই এমন পদক্ষেপ।

 

তবে আমাদের মধ্যে এমন মানবেতর আর পরিবেশের হানিকর অবস্থা তেমন কোন সাড়া না জাগালেও বিদেশি পরিদর্শক যারাই এসেছেন চট্টগ্রামে সবাই গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ইয়ার্ডের সার্বিক অবস্থা দেখে। ক্যামেরুন কনওয়ে নামের এক বিদেশি অনুসন্ধানী সাংবাদিক (এবং কবি) চট্টগ্রামের এই জাহাজভাঙ্গা শিল্পের নানান দিক নিয়ে তো একটি বই লিখে ফেলেছেন – Chittagong : Poems and Essays

 

Share on Facebook

মন্তব্য করুন

×