এডুইন হাবল: মহাবিশ্বকে যিনি নতুন করে দেখতে শেখালেন

এখন আমরা কথায় কথায় বলি, মহাবিশ্বের ব্যাপ্তি অসীম; কোটি কোটি ছায়াপথ বা গ্যালাক্সি আছে এতে। মহাবিশ্ব যে এত বিরাট ১০০ বছর আগে তা মানুষের কল্পনা করাও অসম্ভব ছিল। তখন যে প্রযুক্তির টেলিস্কোপ ছিল জ্যোতির্বিদদের নাগালে আর তা থেকে যা পর্যবেক্ষণ করা যেত তাতে তাদের পক্ষে এরকম ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করাই স্বাভাবিক।

 

মাউন্ট উইলসন মানমন্দির

মাউন্ট উইলসন মানমন্দির

 

১৯১৯ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার মাউন্ট উইলসন মানমন্দিরে বসানো হল ১০০ ইঞ্চি হুকার টেলিস্কোপ। সে সময়ের পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহৎ টেলিস্কোপ ছিল এটি। প্রায় একই সময়ে মাউন্ট উইলসন মানমন্দিরে যোগদান করেন বিজ্ঞানী এডুইন হাবল। তিনি এই বিরাট টেলিস্কোপটি ব্যবহার করে যুগান্তকারী কিছু বিষয় আবিস্কার করলেন কয়েক দিন বাদেই।

 

১০০ ইঞ্চি হুকার টেলিস্কোপ, মাউন্ট উইলসন মানমন্দির

মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের ধারণা পাল্টে দিয়েছিল এই যন্ত্রটি

 

মজার ব্যাপার হল, হাবল শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে অনার্স করার পর অক্সফোর্ডে আইনশাস্ত্র নিয়ে পড়াশুনা করেন। তারপর আমেরিকায় ফিরে গিয়ে কিছুদিন শিক্ষকতা করেন। এরপর তাঁর মনে হল, জ্যোতির্বিদ্যা নিয়ে পড়াশুনা করা দরকার। আবারো তিনি শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে  ভর্তি হলেন।  পিএইচডি করার সময় মাউন্ট উইলসন মানমন্দিরে যোগদানের অফার পেয়েছিলেন। ডক্টরেট করা শেষে চলে যান সেখানে।

 

এডুইন হাবল: মহাবিশ্বকে যিনি নতুন করে দেখতে শেখালেন

এডুইন হাবল: মহাবিশ্বকে যিনি নতুন করে দেখতে শেখালেন

 

মাউন্ট উইলসনে হাবল অ্যান্ড্রোমিডা নেবুলা পর্যবেক্ষণে মনোনিবেশ করলেন। শক্তিশালী হুকার টেলিস্কোপের কেরামতিতে হাবল দেখলেন অ্যান্ড্রোমিডা নেবুলা আসলে অনেক অনেক তারার সমষ্টি, একটি ছায়াপথ!

 

টেলিস্কোপে মহাকাশ পর্যবেক্ষণ করছেন এডউইন হাবল

টেলিস্কোপে মহাকাশ পর্যবেক্ষণ করছেন এডুইন হাবল

 

আর তা অবস্থান করছে পৃথিবী থেকে ৯,০০,০০০ আলোকবর্ষ দূরে (পরে আরও সূক্ষ্ম অঙ্ক কষে আসল দুরত্ব বের করা হয়েছিল ২৪ লক্ষ আলোকবর্ষ, হাবলের হিসাবের কয়েকগুণ বেশি!)। এই দূরত্বটা এত ব্যাপক যে তা কোনভাবেই আমাদের গ্যালাক্সির আওতায় পড়ে না।

 

অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি

অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির আবিষ্কার মহাবিশ্বের বিস্তৃতি সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে পাল্টে দিয়েছিল পুরোপুরি

 

হাবল বুঝলেন তিনি একটি গ্যালাক্সি আবিষ্কার করেছেন! আমাদের ছায়াপথ মিল্কিওয়ে ছাড়াও যে আরো ছায়াপথ থাকতে পারে এ ধারণা তখনকার বিজ্ঞানী সমাজে ছিল একদম নতুন।

 

গ্যালাক্সির গ্যালাক্সি

এই ছবিতে জ্বলজ্বলে যত বিন্দু আছে তার সবকটাই গ্যালাক্সি!

 

হাবল বললেন, আমরা যেসব তারা দেখি রাতে তার সবগুলোই তারা নয়। এসব নক্ষত্রের মাঝে আছে হাজারো ছায়াপথ। ছায়াপথগুলো এতোটাই দূরবর্তী যে খালি চোখে সেগুলোকে সাধারণ তারা বলে মনে হয়। শক্তিশালী টেলিস্কোপ দিয়ে দেখলে এদের আসল ছবি পাই আমরা। এই আবিষ্কার বিজ্ঞানী মহলে খুব আলোচিত-সমালোচিত হল। কারণ সে সময়ের সর্বজনবিদিত সত্য ছিল আকাশগঙ্গাই (মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি) মহাবিশ্ব, তার বাইরে আর কিছু নেই। ১৭৫৫ সালে দার্শনিক ইমান্যুয়েল কান্ট এরকম একটি তত্ত্ব দিয়েছিলেন মহাবিশ্ব নিয়ে কিন্তু তা ধোপে টেকেনি সমর্থনের অভাবে।

 

জার্মান দার্শনিক ইমান্যুয়েল কান্ট

মহাবিশ্ব যে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির চেয়ে ঢের বড় এই ধারণার প্রথম প্রবক্তা ছিলেন জার্মান দার্শনিক ইমান্যুয়েল কান্ট

 

হাবল আরও বললেন, মহাবিশ্ব ক্রমশ প্রসারিত হচ্ছে। গ্যালাক্সিগুলো এবং তাতে থাকা নক্ষত্ররা একটি আরেকটি থেকে ক্রমাগত দূরে সরে যাচ্ছে। দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলো বেশি বেগে সরে যাচ্ছে দূরে

 

রেড শিফট

রেড শিফটের মাধ্যমেই হাবল প্রমাণ করেছিলেন নক্ষত্র, ছায়াপথ এসব প্রবল বেগে একে অপরের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে

 

এই দুটো বৈজ্ঞানিক সত্য মহাবিশ্বের ব্যাপ্তি আর তাতে আমাদের অবস্থান নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করলো। কি বিপুল এই মহাবিশ্ব, কি নগণ্য তাতে আমাদের অস্তিত্ব! হাবলের আবিষ্কার প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি গুড়িয়ে দিয়েছিল।

 

বিগার পিকচার অব দি ইউনিভার্স

বিগার পিকচার অব দি ইউনিভার্স, এই ছবিতে বেগুনী-হলদে জালের মত অংশগুলো তৈরি হয়েছে বহু গ্যালাক্সিগুচ্ছ একত্রিত হবার কারণে। মহাবিশ্বে যে হাজার হাজার কোটি গ্যালাক্সি আছে এই ছবিটি তারই একটি নমুনা

 

বিস্তৃত, নতুন এক দৃষ্টিকোণ থেকে মহাবিশ্বকে দেখতে শিখিয়েছিল মানুষকে। হাবলের আবিষ্কার নিউটন, ডারউইন, আইনস্টাইনের আবিস্কারের মত যুগান্তকারী ছিল। হাবলের কাজের উপর আধুনিক অ্যাস্ট্রোফিজিক্স, জ্যোতির্বিদ্যা দাঁড়িয়ে আছে।

 

বিগার পিকচার অব দি ইউনিভার্স

এডুইন হাবলের সম্মানে ১৯৯০ সালে হাবল স্পেস টেলিস্কোপ পাঠানো হয় পৃথিবীর কক্ষপথে

 

এডুইন হাবল আবিষ্কৃত গ্যালাক্সিকে শ্রেণীবিন্যস্ত করার একটি পদ্ধতিও আবিষ্কার করেন। একে হাবল সিকোয়েন্স বা হাবল ক্রম বলা হয়।

হাবল নোবেল পুরষ্কার পান নি। কিন্তু খ্যাতি লাভ করেছিলেন অনেক। নাসা তাঁর সম্মানে বহু বছর পর একটি বড় টেলিস্কোপের নাম রেখেছে – হাবল স্পেস টেলিস্কোপ।  পৃথিবীর চারদিকে ঘুরে হাবল টেলিস্কোপ অনেক অনেক দূরের তারা, নীহারিকা, ছায়াপথ, সুপারনোভার  শ্বাসরুদ্ধকর সব ছবি পাঠাচ্ছে পৃথিবীতে।

 

পিলারস অব ক্রিয়েশন, ঈগল নীহারিকা

পিলারস অব ক্রিয়েশন, ঈগল নীহারিকা, হাবল স্পেস টেলিস্কোপ দিয়ে দেখা

 

রিং নেবুলা

রিং নেবুলা

 

সমব্রেরো হ্যাটের মত দেখতে গ্যালাক্সি

সমব্রেরো হ্যাটের মত দেখতে গ্যালাক্সি

 

আরও একটি চোখ ধাঁধানো নীহারিকা, হাবল টেলিস্কোপের তোলা

আরও একটি চোখ ধাঁধানো নীহারিকা, হাবল টেলিস্কোপের তোলা

 

 

Share on Facebook

মন্তব্য করুন

×